ছবি: সংগৃহীত
দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কারাগারে থাকা বন্দিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দিচ্ছে সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে অংশ নিতে পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে বন্দিদের ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এই উদ্যোগের পরও বন্দিদের মধ্যে ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের আগ্রহ আশানুরূপ হয়নি।
কারা-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের ৭৫টি কারাগারে মোট বন্দির সংখ্যা ৮৪ হাজার ৪০০ জন। এদের মধ্যে ভোট দেওয়ার জন্য অনলাইনে নিবন্ধন করেননি ৭৮ হাজার ১৬০ জন। অর্থাৎ মোট বন্দির একটি ক্ষুদ্র অংশ—মাত্র ৬ হাজার ২৪০ জন—নির্ধারিত অ্যাপ ব্যবহার করে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন।
গতকাল রোববার কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধন সম্পন্ন করা ৬ হাজার ২৪০ বন্দির মধ্যে বর্তমানে কারাগারে আছেন ৫ হাজার ৯২০ জন। নিবন্ধনের পর ৩২০ জন বন্দি জামিনে মুক্ত হয়েছেন। তবে কারা প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, নিবন্ধন করা কোনো বন্দি জামিন পেলেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চাইলে তাকে নির্ধারিত দিনে আবার কারাগারের ভেতরে এসে ভোট দিতে হবে এবং ভোট শেষে তিনি পুনরায় বের হয়ে যাবেন।
নিবন্ধন কম হওয়ার কারণ
কারা কর্তৃপক্ষ নিবন্ধন কম হওয়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছে। প্রথমত, অনেক বন্দির ধারণা—তারা যেকোনো সময় জামিন পেয়ে কারাগার থেকে মুক্ত হতে পারেন। সে কারণে কারাগারে থেকেই ভোট দেওয়ার জন্য আলাদা করে নিবন্ধনের প্রয়োজন মনে করেননি তারা।
দ্বিতীয়ত, কারাগারে থাকা অনেক পুরোনো বন্দির জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেই। এনআইডি ছাড়া অনলাইনে ভোটার নিবন্ধন সম্ভব না হওয়ায় তারা এ প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে গেছেন।
তৃতীয়ত, বন্দিদের একটি অংশ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। কারা সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই শ্রেণির বন্দিদের মধ্যে ভোটার নিবন্ধনের বিষয়ে সাড়া তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া গেছে।
এনআইডি সমস্যার সমাধানে পরিকল্পনা
যেসব বন্দির এনআইডি নেই, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির বিষয়ে আলাদা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কারা কর্তৃপক্ষ। তবে এই কার্যক্রম জাতীয় নির্বাচনের পর বাস্তবায়ন করা হবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চেয়ে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
কারা প্রশাসন জানায়, ২০১৯ সাল থেকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে বন্দিদের তথ্য সংরক্ষণ শুরু হয়। এরপর থেকে কারাগারে আসা বন্দিদের এনআইডিসংক্রান্ত তথ্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে। তবে ২০১৯ সালের আগের অনেক বন্দির এনআইডির তথ্য সংরক্ষিত নেই। আবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বন্দির এনআইডি আদৌ তৈরি করা হয়নি।
বিভাগভিত্তিক নিবন্ধনের চিত্র
কারা সূত্র অনুযায়ী, কারাগারের সাংগঠনিক কাঠামোয় ঢাকা বিভাগকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারসহ ১০টি কারাগার ঢাকা বিভাগ-১-এর আওতায়। এই বিভাগে মোট এক হাজার ৪০৯ জন বন্দি ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছেন।
অন্যদিকে গাজীপুরের কাশিমপুরের চারটি কারাগারসহ ১০টি কারাগার ঢাকা বিভাগ-২-এর আওতাধীন। এখানে নিবন্ধন করেছেন ৯৬০ জন বন্দি।
চট্টগ্রাম বিভাগে বিভিন্ন কারাগার মিলিয়ে নিবন্ধন করেছেন এক হাজার ১০১ জন। খুলনা বিভাগে ৬৯০, রাজশাহীতে ৬৯৪, রংপুরে ৩০৫, বরিশালে ২৩৪, ময়মনসিংহে ১৫৮ এবং সিলেট বিভাগে ৫১০ জন বন্দি ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন।
বড় কারাগারগুলোতে নিবন্ধনের হার
কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মোট বন্দি সংখ্যা ৯ হাজার ৮৭৪ জন। সেখানে ভোট দেওয়ার জন্য অনলাইনে আবেদন করেছেন ৯৯০ জন বন্দি। কেরানীগঞ্জ বিশেষ কারাগারে নিবন্ধন করেছেন ৮৯ জন।
ফরিদপুর জেলা কারাগারে ৫২, নারায়ণগঞ্জে ৮৮, মুন্সীগঞ্জে ২৭, রাজবাড়ীতে ৯৭, মাদারীপুরে ২৫, গোপালগঞ্জে ৩৩ এবং শরীয়তপুরে সাতজন বন্দি নিবন্ধন করেছেন।
গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১-এ ১০১ জন নিবন্ধন করলেও কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ পাঁচ হাজার ২০০ বন্দির মধ্যে নিবন্ধন করেছেন মাত্র ১৩৭ জন। কাশিমপুর নারী কারাগারে ৪৬ জন নিবন্ধন করেছেন। টাঙ্গাইলে ৭১, কিশোরগঞ্জে ১৫, গাজীপুরে ১৪, নরসিংদীতে ২৮ এবং মানিকগঞ্জে ২৭ জন বন্দি ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে ছয় হাজার ৫৭৩ বন্দির মধ্যে নিবন্ধন করেছেন মাত্র ৩৭৮ জন, যা শতকরা হিসাবে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। কক্সবাজারে ৬০, খাগড়াছড়িতে ১৬, রাঙামাটিতে আট, বান্দরবানে ৫২, কুমিল্লায় ৩২৪ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৪ জন বন্দি নিবন্ধন করেছেন।
রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দির সংখ্যা দুই হাজার ৬০১ জন। এর মধ্যে ভোটার নিবন্ধন করেছেন ২৭৩ জন।
ভোট গ্রহণের প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ
কারা কর্মকর্তারা জানান, বন্দিদের ভোট গ্রহণ কার্যক্রমে যুক্ত কারা সদস্যদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যে স্থানগুলোতে বন্দিরা ভোট দেবেন, সেখানে প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, প্রিন্টার, ইন্টারনেটসহ অন্যান্য সরঞ্জাম রয়েছে কিনা—তা জেলা নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়েছে।
নিবন্ধিত বন্দিরা কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ‘বহির্গামী খাম’ (ফরম-৯ক) পাবেন। এতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য দুটি আলাদা ব্যালট পেপার, ভোট প্রদানের নির্দেশিকা, ঘোষণাপত্র (ফরম-৮) এবং রিটার্নিং অফিসারের ঠিকানা সংবলিত ফেরত খাম (ফরম-১০খ) থাকবে।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জেলখানার ভেতরে ভোট প্রদানের জন্য গোপন কক্ষ বা উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ভোটগ্রহণ শেষে খামগুলো সুরক্ষিতভাবে সংগ্রহ করে দ্রুত ডাক বিভাগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠানো হবে।
যেভাবে ভোট দেবেন বন্দিরা
কারা সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট এলাকার নিবন্ধিত বন্দি ভোটারদের জন্য নির্বাচন কমিশন আলাদাভাবে খাম পাঠাবে। তিনটি পৃথক খামে থাকবে ব্যালট পেপার, ভোট প্রদানের নিয়মাবলি এবং স্বাক্ষরের জন্য নির্ধারিত কাগজপত্র। বন্দিরা ব্যালট পেপারে ভোট দিয়ে খাম সিল করবেন। এরপর ব্যালট পেপারের খাম ও স্বাক্ষরসংবলিত কাগজ আরেকটি খামে ভরে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবেন। কারা কর্তৃপক্ষ এসব খাম ডাক বিভাগের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠাবে। পরে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ভোটের সঙ্গে এগুলো যুক্ত করা হবে।
কারা কর্মকর্তারাও পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন।
কারা মহাপরিদর্শকের বক্তব্য
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, কারাগারে থেকেও বন্দিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া একটি ইতিবাচক ও যুগান্তকারী উদ্যোগ। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল নিবন্ধনের সংখ্যা আরও বেশি হবে। তবে এনআইডি না থাকাসহ কয়েকটি কারণে তা সম্ভব হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেউ ভোট দিতে চাইলে আমরা তাকে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারি। কিন্তু ভোট দেওয়ার জন্য কাউকে বাধ্য করার সুযোগ নেই।’
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন, বন্দিরা যাতে নির্বিঘ্নে ও সঠিকভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে বিষয়ে কারা প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



