ছবি: সংগৃহীত
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) অভ্যন্তরে আবারও অস্বচ্ছতা ও স্বচ্ছতা সংকট নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সংস্থাটিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ৪৭ জন পরামর্শক নিয়োগের জন্য “গোপন টেন্ডার” বা সীমিত দরপত্র আহ্বানকে কেন্দ্র করে প্রশ্নের ঝড় উঠেছে বিভিন্ন স্তরে—বেবিচকের কর্মকর্তা, বিমান মন্ত্রণালয়, ক্রয়সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ এবং এভিয়েশন গবেষকদের মধ্যে।
ঘটনাটি শুধু একটি সাধারণ নিয়োগ নয়; বরং দেশের এভিয়েশন নিরাপত্তা, নীতিমালা প্রণয়ন, বিমানবন্দর পরিচালনা, আইকাও মানদণ্ড পূরণ এবং রাষ্ট্রের বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই পুরো প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় তা এখন জনস্বার্থের বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
অপ্রকাশিত ও অফলাইন টেন্ডার: কীভাবে শুরু হলো এই “গোপন প্রক্রিয়া”
বেবিচকের প্রশাসন শাখা অনলাইন দরপত্র ব্যবস্থা—জাতীয় ই-জিপি প্ল্যাটফর্ম—এড়িয়ে হঠাৎ করেই অফলাইনে দরপত্র আহ্বান করে। কোনো পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি নেই, সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ নেই, নোটিফিকেশন নেই—এমনকি অনেক বিভাগীয় কর্মকর্তাও জানতে পারেননি।
গত বুধবার দরপত্র বাক্স খোলা হলে দেখা যায়:
-
৪৭টি পদের বিপরীতে আবেদন ১৩০ জনের
-
আবেদনকারীদের বড় অংশই আগে বেবিচকে চাকরি করেছেন
-
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে যারা পরামর্শক ছিলেন তারাও আবেদন করেছেন
-
বাইরে থেকে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মতো কেউই সুযোগ পাননি
-
কারণ—অনেকে জানতেই পারেননি যে টেন্ডার হয়েছে
এতে সন্দেহ আরও গভীর হয়েছে যে, আগেই কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম ঠিক করা ছিল কি না।
একজন কর্মরত কর্মকর্তা বলেন, “অভ্যন্তরীণ কর্মীদের অনেকেই জানতেন না। টেন্ডারটা এতটাই গোপন রাখা হয় যে এটা ‘নিয়মিত সরকারি টেন্ডার’ ছিল না—এটা পুরোপুরি সীমিত পরিসরে গোপনে সম্পন্ন করা হয়েছে।”
পিপিআর আইন উপেক্ষা—সরকারি নির্দেশনা থামাতে পারেনি প্রক্রিয়াকে
সরকারি ক্রয়বিধি পিপিআর (Public Procurement Rules) স্পষ্ট বলছে—
-
সরকারি অর্থে যেকোনো সেবা বা পণ্য ক্রয়ে উন্মুক্ত টেন্ডার বাধ্যতামূলক
-
পরামর্শক নিয়োগও সেবাক্রয়
-
তাই গোপন বা সীমিত টেন্ডার আইন লঙ্ঘনের শামিল
বিমান মন্ত্রণালয় নিজে নির্দেশ দিয়েছে পিপিআর মানতে।
বেবিচকের ফ্লাইট সেফটি বিভাগও লিখিতভাবে বলেছে— উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমেই পরামর্শক নিয়োগ করতে হবে।
কিন্তু রহস্যজনক কারণে বেবিচকের প্রশাসন বিভাগ এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে। প্রশ্ন উঠছে— এই অস্বচ্ছতা কার স্বার্থে? কেন? এবং কার নির্দেশে?
উচ্চ বেতন কাঠামো নিয়ে নতুন বিতর্ক: বছরে ব্যয় কয়েকশ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে
৪৭ জন পরামর্শকের জন্য বেতন ধরা হয়েছে প্রতি মাসে গড়ে ৫–৮ লাখ টাকা।
এর অর্থ—
-
মাসে সর্বনিম্ন: ২.৫ থেকে ৩.৫ কোটি টাকা
-
বছরে সম্ভাব্য ব্যয়: ৩০–৪০ কোটি টাকা
-
প্রয়োজনে চুক্তি নবায়ন হলে ব্যয় আরও বাড়বে
বেবিচকের অনেক কর্মকর্তা এ বেতন কাঠামোতেও প্রশ্ন তুলছেন। তাদের দাবি—উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা হলে কম খরচে বেশি যোগ্য জনবল পাওয়া যেত।
একজন কর্মকর্তা মন্তব্য করেন: “গোপন দরপত্র মানেই সন্দেহ। সরকারি অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে কি না—এটা কেউ যাচাই করতে পারছে না।”
পরামর্শকদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—তাই স্বচ্ছতার গুরুত্ব আরও বেশি
পরামর্শকদের মাধ্যমে বেবিচক যে কাজগুলো করাবে, সেগুলো দেশের বিমান নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা, আইকাওর মানদণ্ড পূরণ এবং বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরামর্শকদের দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. এভিয়েশন সেফটি ও সিকিউরিটি
-
বিমান নিরাপত্তা নীতি তৈরি ও আপডেট
-
নিরাপত্তা অডিট পরিচালনা
-
আইকাও মানদণ্ডে ঘাটতি সংশোধন
২. গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও কার্গো নিরাপত্তা
-
মান বজায় রাখা
-
ঝুঁকি শনাক্তকরণ
৩. এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট
-
নেভিগেশন সিস্টেম উন্নয়ন
-
নতুন রাডার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পরামর্শ
৪. অবকাঠামো ও প্রকৌশল পরিকল্পনা
-
বিমানবন্দর সম্প্রসারণ
-
টার্মিনাল ও রানওয়ে উন্নয়ন
৫. নীতিমালা ও রেগুলেশন
-
নিরাপত্তা নীতিমালা
-
এয়ারক্রাফট অপারেশন স্ট্যান্ডার্ড
-
পাইলট লাইসেন্সিং
এসব ক্ষেত্রে সঠিক জনবল নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সামান্য ভুলও বিমান নিরাপত্তায় বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
পূর্বের আইনি প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ বন্ধ করেছিলেন মন্ত্রণালয়—তবুও সেই পদ্ধতিতে ফিরে গেল বেবিচক
এর আগে বেবিচকের চেয়ারম্যান বোর্ডের অনুমতিতে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে পরামর্শক নিয়োগ করতেন। কিন্তু এই পদ্ধতিকে আইনি ভিত্তিহীন বলে বাতিল করে মন্ত্রণালয়। তারপর সিদ্ধান্ত হয়—
স্বচ্ছ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মেধাবী জনবল নিয়োগ করতে হবে।
কিন্তু বর্তমান প্রশাসন বিভাগ মন্ত্রণালয়ের সেই সিদ্ধান্তকে “বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে” আবারও গোপনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে, যা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন উঠেছে।
বেবিচক প্রশাসনের ব্যাখ্যা: সময় স্বল্পতার যুক্তি
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাবলুর রহমান বলেন—
-
সময় স্বল্পতার কারণে উন্মুক্ত দরপত্র করা হয়নি
-
কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিয়েছে
-
বিশেষ কাউকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ঠিক নয়
তিনি দাবি করেন—১৩০ জন আবেদন করেছেন, যাচাই-বাছাই করে যোগ্যদেরই নেওয়া হবে।
তবে ভেতরের অনেকে মনে করেন— এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ এত গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ কখনোই “হঠাৎ” জরুরি হয়ে ওঠে না।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: রাষ্ট্রের অর্থ ও ন্যায্যতার লঙ্ঘন
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন—“সরকারি ক্রয়পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকার সঠিক ব্যবহার এবং সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা। গোপন বা সীমিত দরপত্র মানেই ‘ন্যাচারাল জাস্টিস’ লঙ্ঘন। এত বড় পরামর্শক নিয়োগ গোপনে করা ঠিক নয়।”
তিনি আরও বলেন— ৪৭ জন পরামর্শক নিয়োগ কোনো ছোট বিষয় নয়। বিপুল অর্থ ব্যয় হবে, তাই স্বচ্ছতা এখানে অত্যন্ত জরুরি ছিল।
স্বচ্ছতার অভাব প্রশ্নবিদ্ধ করছে পুরো প্রক্রিয়া
৪৭ জন পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে বেবিচকে যে ধরনের গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে, তা—
-
পিপিআর আইনের লঙ্ঘন
-
স্বচ্ছ ক্রয়পদ্ধতির বিরোধী
-
রাষ্ট্রের অর্থের সঠিক সাশ্রয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে
-
মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করে
-
এবং সর্বোপরি—বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে
অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন— এটি কি শুধুই “সময় স্বল্পতা”, নাকি প্রক্রিয়াটিকে গোপন রাখার পেছনে অন্য কোনো স্বার্থ কাজ করেছে?
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



