ছবি: সংগৃহীত
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। উনিশ শতকে ব্রিটিশ শাসনামলে টানা একটি রেখা—ডুরান্ড লাইন—২০২৬ সালেও দুই প্রতিবেশী দেশের জন্য সংঘাতের কেন্দ্রে রয়ে গেছে। ২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতায় বসার পর পাকিস্তানের সঙ্গে এই সীমান্তে সংঘর্ষ হয়েছে ৭৪টি। শুক্রবার ৭৫ নম্বর সংঘর্ষকে ‘সম্মুখ বা প্রকাশ্য যুদ্ধ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে ইসলামাবাদ।
ঐতিহাসিক পটভূমি: কী এই ডুরান্ড লাইন
‘Durand Line’ মূলত ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ ভারতের পররাষ্ট্রসচিব স্যার মর্টিমার ডুরান্ডের উদ্যোগে নির্ধারিত একটি সীমারেখা। সে সময় আফগানিস্তানের শাসক ছিলেন আমির আব্দুর রহমান খান। ব্রিটিশদের সঙ্গে তার চুক্তির মাধ্যমে ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যকার প্রশাসনিক সীমা নির্ধারিত হয়। প্রায় ২,৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তরেখা বর্তমানে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশ ঘেঁষে বিস্তৃত।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর ইসলামাবাদ ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু আফগানিস্তান শুরু থেকেই এই স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাদের যুক্তি—এটি কখনোই স্থায়ী আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে নির্ধারিত হয়নি; বরং ছিল শাসনসীমা নির্ধারণের একটি প্রশাসনিক চুক্তি। ফলে পশতুন ও বেলুচ জনগোষ্ঠী দুই দেশে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা আজও রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার বড় কারণ।
২০২১ পরবর্তী বাস্তবতা: সংঘর্ষের ধারাবাহিকতা
২০২১ সালে ন্যাটো ও মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবান ক্ষমতা গ্রহণ করে। এরপর থেকেই সীমান্তজুড়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১ সালের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে অন্তত ৭৫টি সংঘর্ষ হয়েছে। এর মধ্যে কয়েক দফা পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইসলামাবাদের দাবি, এসব অভিযান পরিচালিত হয়েছে সীমান্তঘেঁষা জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে আফগান ভূখণ্ডে সক্রিয় Tehrik-i-Taliban Pakistan (টিটিপি) তাদের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে এবং কাবুলের শাসকগোষ্ঠী তাদের প্রতি নরম অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে কাবুল প্রশাসন এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, তারা কোনো দেশের বিরুদ্ধে নিজেদের ভূমি ব্যবহার করতে দেয় না।
টিটিপি ও আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী
টিটিপি ২০০৭ সালে পাকিস্তানে আত্মপ্রকাশ করে এবং আদর্শিকভাবে আফগান তালেবানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। একইসঙ্গে বেলুচিস্তানে সক্রিয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী Balochistan Liberation Army (বিএলএ) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হামলা বাড়িয়েছে। ইসলামাবাদের মতে, সীমান্তের ওপার থেকে এসব গোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তা পায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, আফগান তালেবান টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে অনাগ্রহী। কারণ দুই গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এবং অঞ্চলে সক্রিয় Islamic State – Khorasan Province (আইএসকেপি)-এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের উত্থান। টিটিপির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে তারা আইএসকেপিতে যোগ দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
কেন সীমান্তেই উত্তেজনা তীব্র
সীমান্ত এলাকা পাহাড়ি ও দুর্গম হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ কঠিন। পাকিস্তান ইতোমধ্যে সীমান্তজুড়ে বেড়া নির্মাণ করেছে, যা আফগানিস্তান বারবার আপত্তি জানিয়েছে। আফগান তালেবান এই বেড়াকে অবৈধ বলেছে এবং কয়েকবার তা অপসারণের চেষ্টা হয়েছে। ফলে ছোটখাটো সংঘর্ষ দ্রুত বড় আকার নেয়।
সামরিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও পার্থক্য স্পষ্ট। পাকিস্তানের বিমান বাহিনী রয়েছে, কিন্তু তালেবান শাসিত আফগানিস্তানের কার্যকর বিমান সক্ষমতা সীমিত। তাই সীমান্তে গোলাবর্ষণ ও স্থল সংঘর্ষই প্রধান রূপ নিচ্ছে। পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সম্ভাবনা কম হলেও ভারী অস্ত্রের ব্যবহার পরিস্থিতিকে যে কোনো সময় জটিল করে তুলতে পারে।
ডুরান্ড লাইন: রাজনৈতিক অস্বীকৃতি বনাম বাস্তবতা
ডুরান্ড লাইন নিয়ে বিতর্ক কেবল ইতিহাসের নয়, বর্তমান ভূরাজনীতিরও অংশ। আফগানিস্তানের ধারাবাহিক সরকার—রাজতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র বা তালেবান—কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে এই সীমান্তকে চূড়ান্ত আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে মেনে নেয়নি। তাদের দাবি, এটি পশতুন জাতিসত্তাকে বিভক্ত করেছে এবং জনগণের মতামত ছাড়াই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান বলছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত পরিবর্তনের প্রশ্নই ওঠে না। সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের সার্বভৌম অধিকার।
আঞ্চলিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
দুই দেশের এই টানাপোড়েন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলছে। বাণিজ্য, সীমান্তপারের জনগোষ্ঠীর চলাচল, শরণার্থী সংকট—সবকিছুই এর সঙ্গে যুক্ত। তুরস্ক ও কাতারের মতো দেশ কয়েকবার মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ডুরান্ড লাইন নিয়ে ঐতিহাসিক বিরোধ, টিটিপি প্রশ্নে অবিশ্বাস এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা উদ্বেগ—এই তিনটি কারণ মিলেই সংঘাতের চক্রকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না এলে সীমান্তে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ আরও বাড়তে পারে।
উনিশ শতকের এক প্রশাসনিক রেখা আজও দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু। ইতিহাস, জাতিসত্তা, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক রাজনীতির জটিল সমীকরণে ডুরান্ড লাইন যেন কেবল একটি সীমান্ত নয়—বরং দীর্ঘস্থায়ী অবিশ্বাসের প্রতীক।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



