ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্বর্ণের বাজারে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে এই মূল্যবান ধাতুর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম সর্বকালের সব রেকর্ড ভেঙে প্রতি আউন্সে ৪ হাজার ৮০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৮২১ দশমিক ২৬ ডলারে। দিনের একপর্যায়ে দাম আরও বেড়ে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৮৪৩ দশমিক ৬৭ ডলারে পৌঁছায়, যা ইতিহাসে স্বর্ণের সর্বোচ্চ দাম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে ফেব্রুয়ারি মাসে ডেলিভারির জন্য মার্কিন স্বর্ণের ফিউচারও শক্তিশালী ঊর্ধ্বগতি দেখিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার মার্কেটে স্বর্ণের দাম ১ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৮১৩ দশমিক ৫০ ডলারে লেনদেন হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, একসঙ্গে স্পট ও ফিউচার—উভয় বাজারেই এই ধরনের উত্থান স্বর্ণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার গভীরতা নির্দেশ করে।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়তে থাকা উত্তেজনা। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও অবস্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার আগ্রাসী অবস্থান এবং ইউরোপের দেশগুলোর ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
ক্যাপিটাল ডটকমের সিনিয়র বাজার বিশ্লেষক কাইল রোডা বলেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সম্ভাব্য শুল্ক আরোপ এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে অনড় অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এর ফলে শুধু বৈশ্বিক রাজনীতিই নয়, বরং মার্কিন অর্থনীতির ওপরও বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে ডলার বিক্রি করে স্বর্ণের মতো নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন।
মঙ্গলবার এক বক্তব্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানান, গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার লক্ষ্য থেকে তার ‘পিছু হটার কোনও সুযোগ নেই’। যদিও তিনি ন্যাটো মিত্রদের ওপর সরাসরি সামরিক আক্রমণ বা সংঘাতের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন, তবুও তার বক্তব্য ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ইউরোপ যদি গ্রিনল্যান্ড দখলের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, তাহলে শুধু শুল্ক হুমকি দিয়ে তাদের ভয় দেখানো সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে, ডলারের দুর্বলতাও স্বর্ণের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। ডলারের মান কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকা বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণ তুলনামূলকভাবে সস্তা হয়ে উঠেছে। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা বেড়েছে, যা সরাসরি বাজারদরকে আরও ওপরে ঠেলে দিচ্ছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের আসন্ন বৈঠকও বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২৭-২৮ জানুয়ারির বৈঠকে ফেড সুদের হার অপরিবর্তিত রাখবে। সুদের হার কম বা স্থির থাকলে অ-ফলনশীল সম্পদ হিসেবে পরিচিত স্বর্ণের আকর্ষণ বাড়ে, কারণ তখন সুদভিত্তিক বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত লাভ তুলনামূলকভাবে কমে যায়।
তবে স্বর্ণের বিপরীতে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। একই দিনে স্পট মার্কেটে রুপার দাম ১ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৯৩ দশমিক ৫৯ ডলারে নেমে আসে। প্লাটিনামের দাম শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৪৪৫ দশমিক ৯৬ ডলারে এবং প্যালাডিয়ামের দাম শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৮৫৭ দশমিক ১৯ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, যতদিন পর্যন্ত বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এই ধরনের অনিশ্চয়তা বিরাজ করবে, ততদিন স্বর্ণের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণ আবারও প্রমাণ করছে—অস্থির বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি এখনো সবচেয়ে ভরসার নাম।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



