ছবি: সংগৃহীত
টানা পাঁচ দিনের তীব্র উত্তেজনা ও শ্রমিক অসন্তোষের মেঘ কাটিয়ে অবশেষে স্বাভাবিকতার মুখ দেখছে সাভার ও আশুলিয়ার পোশাক শিল্পাঞ্চল। বেতন কাঠামো নিয়ে টানা আন্দোলনের পর অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদনে গতি ফিরেছে। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনের ফলে কারখানা কর্তৃপক্ষ উৎপাদন চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, আর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন প্রায় ৮০ শতাংশ পোশাক শ্রমিক।
শুক্রবার সকাল থেকেই শিল্পাঞ্চলের চিত্র ছিল একেবারেই ভিন্ন। সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল, পদ্মার মোড় থেকে শুরু করে আশুলিয়ার নরসিংহপুর, বাইপাইল, জিরাবো ও পুকুরপাড় এলাকার রাস্তাগুলোতে শ্রমিকদের গমনাগমন শুরু হয়। নিজ নিজ কারখানার ফটকে সিকিউরিটি গার্ডদের পরিচয়পত্র দেখিয়ে শৃঙ্খলার সঙ্গে প্রবেশ করেন শ্রমিকরা। এতদিন যে কারখানাগুলোতে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক বিরাজ করছিল, সেখানে দুপুর পর্যন্ত অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও মনোরম পরিবেশে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা গেছে। দীর্ঘ আন্দোলনের পর কারখানায় কাজের পরিবেশ ফিরে আসায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শ্রমিক ও কর্মকর্তা উভয় পক্ষই।
বিভিন্ন পোশাক কারখানার মানবসম্পদ (এইচআর) বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিকের উপস্থিত হওয়াটা অত্যন্ত ইতিবাচক সংকেত। তাদের মতে, মূলত বন্ধের দিন হওয়ায় কিছু শ্রমিক অনুপস্থিত থাকতে পারেন, তবে শিল্পাঞ্চলে পুরোপুরি শান্ত পরিবেশ বজায় থাকলে আগামী শনিবার থেকেই কারখানায় শ্রমিকদের উপস্থিতি শতভাগে পৌঁছাবে। নতুন মজুরি কাঠামো সংক্রান্ত ঘোষণার পর শ্রমিকদের মাঝে কাজের প্রতি উদ্দীপনা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
শিল্পাঞ্চলে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ঢাকা-আরিচা ও আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। সকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া উপস্থিতিতেই কারখানার গেটগুলো উন্মুক্ত করে দেয় মালিকপক্ষ। সড়ক ও মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও এপিবিএনের পাশাপাশি ১৩ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুরো এলাকায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তদারকিতে নিয়োজিত আছেন আটজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। ফলে ঢাকা-আরিচা ও বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রূপ নিয়েছে এবং দূরপাল্লার যানবাহনসহ স্থানীয় গণপরিবহন নিরবচ্ছিন্নভাবে চলাচল করছে।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশের সুপারিন্টেন্ডেন্ট (এসপি) মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, বিগত কয়েকদিন ধরে চলা ঘটনাগুলো প্রকৃতপক্ষে সাধারণ শ্রমিকদের আন্দোলন ছিল না। একটি অশুভ রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও পতিত সরকারের দোসররা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এবং পুলিশকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে শিল্পাঞ্চল অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালিয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতেও এই চক্রটি পুলিশ ও সাধারণ জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে জনপদের ক্ষতি সাধন করেছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে যাতে কেউ পুনরায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে।
মজুরি কমিশন বোর্ডের নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার পর শ্রমিকদের মনে দানা বাঁধা অসন্তোষ অনেকটাই দূর হয়েছে। ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামিমা পারভীন শিল্পী জানিয়েছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মজুরি কমিশন বোর্ডের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারি মাসেই শ্রমিকরা ডিসেম্বর মাসের বর্ধিত বেতন হাতে পাবেন। এই সিদ্ধান্তের বার্তা পৌঁছানোর পরই বৃহস্পতিবার থেকে অনেক কারখানায় ধীরে ধীরে উৎপাদন শুরু হয় এবং শুক্রবার তা আরও গতি পায়। বন্ধের দিনেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবির সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, গত কয়েকদিন যাবত প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা সর্বনিম্ন বেতনের দাবিতে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার কারণে সাভার-আশুলিয়া এলাকা স্থবির হয়ে পড়েছিল। ওইসব সহিংসতা ও ভাঙচুরের ঘটনায় সাভার ও আশুলিয়া থানায় পৃথক ৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে কয়েক হাজার অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতকারীকে আসামি করা হয়। সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম জানিয়েছেন, ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলায় জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে গোয়েন্দা তথ্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কোনো সাধারণ গার্মেন্টস শ্রমিক নেই; তারা মূলত ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে আসা বহিরাগত চক্রের সদস্য।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



