ছবি: সংগৃহীত
দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা কাটছেই না। সরকারের পক্ষ থেকে ডিজিটালাইজেশন, স্বয়ংক্রিয়করণ ও বাণিজ্য সহজীকরণের নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে এর সুফল মিলছে না। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের টাইম রিলিজ স্টাডিতে (টিআরএস) উঠে এসেছে যে, বর্তমানে একটি আমদানি চালান খালাসে গড়ে ১১ দিন ৬ ঘণ্টা সময় অপচয় হচ্ছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি, খাদ্যপণ্য কিংবা বাণিজ্যিক পণ্য—কোনো খাতেই এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া থেকে রেহাই মিলছে না। বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূচকেও বন্দরটির এই স্থবিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক সূচকে চট্টগ্রাম বন্দরের পেছনের চিত্র
কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স ইনডেক্স ২০২৫ অনুযায়ী, বিশ্বের ৪০০টি কনটেইনার বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান অত্যন্ত পেছনের দিকে—৩৩৬তম। যেখানে তুলনীয় বন্দরগুলোতে কনটেইনারের অবস্থানকাল দুই দিনের কম, সেখানে চট্টগ্রাম বন্দরে তা ৯ দিনের বেশি সময় ধরে আটকে থাকে। অন্যদিকে, জাহাজের গড় অবস্থানকাল আড়াই দিনেরও বেশি, অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আদর্শ বন্দরগুলোতে এর জন্য ১৫ থেকে ২৪ ঘণ্টার বেশি লাগার কথা নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশই এই চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার ব্যাপক ঘাটতির কারণে প্রতিদিন বন্দরটিতে প্রায় ১০ কোটি টাকা, অর্থাৎ বছরে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, কনটেইনারের অবস্থানকাল মাত্র এক দিন কমাতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
সময়ক্ষেপণ ও বিলম্বের দায় কার?
পণ্য খালাসে এই দীর্ঘসূত্রতার জন্য কোন পক্ষ কতটা দায়ী, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে তীব্র মতভেদ ও বিতর্ক চলে আসছে। টিআরএসের হিসাব অনুযায়ী, মোট খালাস সময়ের সিংহভাগ অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ সময়ই ব্যয় হয় আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের নিজস্ব পর্যায়ে। এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অংশ ১৪ শতাংশ, কাস্টমস হাউজের ৮ শতাংশ, অন্যান্য সরকারি সংস্থার ২ শতাংশ এবং শিপিং এজেন্টদের ১ শতাংশ সময় ব্যয় হয়।
তবে সমীক্ষার এই তথ্য ও পদ্ধতি নিয়ে কড়া আপত্তি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। তাদের অভিযোগ, গবেষণার সময় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে যথাযথ ও স্বচ্ছভাবে যুক্ত করা হয়নি। বিশেষ করে ম্যানিফেস্ট জমা দেওয়া থেকে শুরু করে বিল অব এন্ট্রি দাখিল পর্যন্ত পুরো সময়টিকে খালাসের সময়ের সঙ্গে যুক্ত করায় প্রকৃত চিত্র আড়ালে চলে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর আগেই বিল অব এন্ট্রি দাখিলের কাজ শেষ হয়ে থাকে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক এ বিষয়ে বলেন, পণ্য খালাসে বিলম্বের মূল ও প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে যৌথ আলোচনার প্রয়োজন। তাঁর মতে, একপাক্ষিক বা মনগড়া কোনো স্টাডি থেকে বাস্তবসম্মত সমাধান আসবে না। আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার এবং অফডক মালিক ও অপারেটরদের সম্পৃক্ত করে প্রতি ধাপে সময়ক্ষেপণের সুনির্দিষ্ট কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে।
খাতভিত্তিক পণ্য খালাসের সময় বিশ্লেষণ
টিআরএসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিভিন্ন খাতের পণ্য খালাসে আলাদা সময় লাগে:
-
মূলধনি যন্ত্রপাতি (এইচএস কোড চ্যাপ্টার ৮৪): এই জাতীয় পণ্য খালাসে গড়ে ১৩ দশমিক ৩ দিন সময় ব্যয় হয়। এর মধ্যে প্রায় ৭ দশমিক ৫ দিনই ব্যয় হয় ম্যানিফেস্ট জমা দেওয়ার পর থেকে বিল অব এন্ট্রি দাখিলের আগ পর্যন্ত। অর্থাৎ, কাস্টমসের আনুষ্ঠানিক শুল্কায়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই মোট সময়ের ৫৬ শতাংশের বেশি সময় পেরিয়ে যায়। ব্যবসায়িক নথিপত্র প্রস্তুতকরণ, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং লেটার অব ইনডেমনিটি সংগ্রহের দীর্ঘসূত্রতাই এর মূল কারণ।
-
খাদ্যপণ্য: খাদ্যদ্রব্য খালাসে গড়ে সময় লাগে ১১ দশমিক ১ দিন।
-
অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্য (চ্যাপ্টার ৯৫): খেলনা ও সমজাতীয় বাণিজ্যিক পণ্য খালাসের গড় সময় ১১ দশমিক ৬ দিন।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অবস্থান ও কায়িক পরীক্ষার পরিসংখ্যান
অন্যদিকে, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দাবি করছে যে তাদের শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় গতিশীলতা এসেছে। এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মাহবুবুর রহমানের এক চিঠিতে জানানো হয়, বিল অব এন্ট্রি দাখিলের মাত্র এক দিনের মধ্যে ৭৭ শতাংশ চালানের মূল্যায়ন সম্পন্ন হয় এবং তিন দিনের মধ্যে এই হার দাঁড়ায় ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশে। কাস্টমসের দাবি, ম্যানিফেস্ট জমা, বিল অব এন্ট্রি দাখিল, শুল্ক-কর পরিশোধ এবং পণ্য বুঝে নেওয়া পর্যন্ত পুরো সময়ের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানিকারক বা তাদের নির্ধারিত এজেন্টদের পর্যায়েই ব্যয় হয়ে থাকে।
কাস্টমসের হিসাব মতে, মোট আমদানি চালানের প্রায় ৯১ দশমিক ০১ শতাংশ চালান কোনো ধরনের কায়িক পরীক্ষা ছাড়াই শুধুমাত্র দলিল যাচাইয়ের মাধ্যমে দ্রুত খালাস দেওয়া হয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশসহ বিশেষ চালানগুলো বাদ দিলে প্রকৃত কায়িক পরীক্ষার হার নেমে আসে মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার ৭৩২টি কনটেইনার স্ক্যান করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১৯৯টি সন্দেহভাজন কনটেইনার কায়িক পরীক্ষা করে ৮১টিতে অনির্দিষ্ট অনিয়ম ও শুল্ক ফাঁকি ধরা পড়ে। অর্থাৎ পরীক্ষিত সন্দেহভাজন কনটেইনারের প্রায় ৪১ শতাংশে অনিয়ম শনাক্ত হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাসে গড়ে প্রায় ১২০টি চালান আটকে পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে পপি সিড, ঘনচিনি বা সাইক্ল্যামেট এবং অ্যান্টিবায়োটিকের মতো নিষিদ্ধ বা মিথ্যা ঘোষণার পণ্যও ধরা পড়েছে।
অংশীজনদের আপত্তি ও প্রশাসনিক জটিলতা
চট্টগ্রাম কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শওকত আলী মনে করেন, ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্ট (আইজিএম) জমা দেওয়ার সময় থেকে বিল অব এন্ট্রি নোটিং পর্যন্ত সময়কে খালাসের সময় হিসেবে ধরলে সঠিক মূল্যায়ন হয় না। অনেক সময় জাহাজ গভীর সমুদ্রে থাকা অবস্থাতেই বিল অব এন্ট্রি নোটিং করা হয়ে থাকে। তাঁর মতে, জাহাজ যখন সরাসরি বন্দরে এসে পৌঁছায়, সেই তারিখ থেকেই খালাসের সময় গণনা করা উচিত।
একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিমও টিআরএসের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, সমীক্ষায় বন্দর কর্তৃপক্ষের কারণে ১৪ শতাংশ সময় অপচয়ের কথা বলা হলেও এর কোনো সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ ভিত্তি নেই। বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকদের সম্মিলিত সময় হিসাব করা হলেও শুধু বন্দরের নিজস্ব কার্যক্রমে কত সময় লাগে, তার আলাদা কোনো সঠিক তথ্য নেই। তথ্য সংগ্রহের সময় বন্দর কর্তৃপক্ষের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও তিনি অবগত নন।
দীর্ঘসূত্রতা নিরসনে গৃহীত উদ্যোগ ও সুপারিশ
পণ্য খালাসে এই দীর্ঘসূত্রতা কমাতে ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ৮৪ ধারা কার্যকরের একটি উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। এই ধারার বিধান অনুযায়ী, পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর পর থেকে পরবর্তী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে বিল অব এন্ট্রি বা আমদানি ঘোষণা বাধ্যতামূলকভাবে দাখিল করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হলে সুনির্দিষ্ট জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় বিধিমালা ও কার্যকর প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ চূড়ান্ত না হওয়ায় আইনটির শতভাগ প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সময় কমানোর আরেকটি কার্যকর উপায় হতে পারে 'প্রি-অ্যারাইভাল প্রসেসিং' বা পিএপি পদ্ধতি। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জাহাজ বন্দরে পৌঁছানোর আগেই ম্যানিফেস্ট, বিল অব এন্ট্রি এবং শুল্কায়নের একটি বড় অংশ সম্পন্ন করা সম্ভব। পিএপি বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী, জাহাজের শেষ পোর্ট অব কল ত্যাগের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিডার অপারেটর, শিপিং এজেন্ট এবং ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারদের প্রয়োজনীয় তথ্য জমা দিতে হয়। টিআরএসের প্রাক্কলন অনুযায়ী, যন্ত্রপাতির চালানে বন্দরে পৌঁছানোর আগেই যদি বিল অব এন্ট্রি দাখিল ও শুল্কায়নের কাজটুকু শেষ করা যায়, তবে মোট খালাস সময় ১৩ দশমিক ৩ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ৩ দশমিক ৯ দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব।
পাশাপাশি, অনুমোদিত অর্থনৈতিক অপারেটর (এইও) মর্যাদা পাওয়া ১৯টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় শুল্কায়নের সময় প্রায় শূন্যে নেমে এলেও নথি প্রস্তুতকরণ, শুল্ক পরিশোধ এবং বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারি নিতে গিয়ে সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে এইও চালানেও গড়ে প্রায় ১১ দিন সময় অপচয় হচ্ছে। এছাড়া বিএসটিআই, বিসিএসআইআরসহ অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ছাড়পত্র প্রক্রিয়াগুলো পুরোপুরি ডিজিটাল করতে 'বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো' (বিএসডব্লিউ)-কে অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।
বন্দরে পড়ে থাকা নিলামযোগ্য কনটেইনারগুলোও ইয়ার্ডের সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের বাড়তি চাপ তৈরি করছে। অনাদায়ীকৃত ৬ হাজার ২৭টি কনটেইনারের মধ্যে ইতিমধ্যেই ১ হাজার ৯৫৫টি নিলাম করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে ১ হাজার ৯৯৮টি কনটেইনারের পণ্য সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এখনও প্রায় ৩ হাজার ৬৬০টি নিলামযোগ্য কনটেইনার অপসারণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।
পরিশেষে, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে ১১ দিন ৬ ঘণ্টা সময় লাগার অর্থ নিছক একটি পরিসংখ্যানগত বিলম্ব নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আমদানিকারকের অতিরিক্ত আর্থিক ব্যয়, ডেমারেজ চার্জ, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন এবং পরিশেষে সাধারণ ভোক্তার ওপর পণ্যের বাড়তি দামের চাপ। তাই জাহাজের আগমন থেকে শুরু করে বিল অব এন্ট্রি দাখিল, শুল্কায়ন, শুল্ক-কর পরিশোধ, এক্সিট নোট এবং শেষ পর্যন্ত আমদানিকারকের হাতে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের সময় আলাদাভাবে পরিমাপ করতে হবে। সব পক্ষকে সম্পৃক্ত করে স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত নতুন সমীক্ষার পাশাপাশি আইনের বিধিমালা প্রণয়ন, পিএপি ও বিএসডব্লিউর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন এবং নিলামযোগ্য কনটেইনার দ্রুত অপসারণের মাধ্যমেই কেবল বন্দরের এই দীর্ঘসূত্রতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



