ছবি: সংগৃহীত
আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে প্রত্যক্ষ করব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী, বাস্তবমুখী ও অংশীদারত্বভিত্তিক করার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আয়করসহ বিভিন্ন প্রত্যক্ষ কর আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে দেশের ব্যবসায়ী সংগঠন, চেম্বার অব কমার্স এবং বণিক সমিতিগুলোর কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব ও সুপারিশ আহ্বান করা হয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের প্রাথমিক কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। বাজেট প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রত্যক্ষ করসংক্রান্ত আইন, বিধিমালা ও বাস্তব প্রয়োগে যে জটিলতা বা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা চিহ্নিত করতে অংশীজনদের সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতি, শিল্পমালিক সংগঠন ও চেম্বারগুলোর কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে নির্ধারিত ছকে তাদের সুপারিশ ও প্রস্তাব তৈরি করে এনবিআরের করনীতি শাখায় হার্ড কপি আকারে জমা দিতে হবে। পাশাপাশি দ্রুত যোগাযোগ ও তথ্য বিনিময়ের সুবিধার্থে সরাসরি ই–মেইলের মাধ্যমেও ([email protected]) প্রস্তাব পাঠানো যাবে। এনবিআরের জনসংযোগ কর্মকর্তা আল আমিন শেখ মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এনবিআর জানিয়েছে, মোট চারটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো ও বিধিমালা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মতামত চাওয়া হয়েছে। এগুলো হলো— আয়কর আইন, ২০২৩; উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৪ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিধিমালা; ভ্রমণ কর আইন, ২০০৩; এবং দান কর আইন, ১৯৯০। এসব আইন ও বিধিমালার বাস্তব প্রয়োগে যেসব সমস্যা দেখা দেয়, করদাতাদের ভোগান্তি, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে—সেসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিতে বলা হয়েছে।
করনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতি আকারে বড় হলেও প্রত্যক্ষ করের পরিধি প্রত্যাশিত হারে সম্প্রসারিত হয়নি। কর–জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি, করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে আইন ও বিধিমালাকে সময়োপযোগী করা জরুরি। এ প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ী সমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা বাজেট প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এনবিআরের চিঠিতে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করা হয়েছে, তারা যেন মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা, কর প্রদান প্রক্রিয়ায় জটিলতা, উৎসে কর কর্তনের অসামঞ্জস্য, দ্বৈত করের ঝুঁকি, অনলাইন রিটার্ন দাখিলে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, আপিল ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি বিষয়ে সুস্পষ্ট ও যুক্তিসংগত প্রস্তাব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে কর প্রশাসনকে আরও অংশীদারত্বমূলক ও সেবামুখী করতে কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন, তাও জানাতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আয়কর আইন, ২০২৩ কার্যকর হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে নতুন সংজ্ঞা, শাস্তিমূলক বিধান ও কর নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে ব্যবসায়ী ও করদাতাদের মধ্যে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৪–এও বিভিন্ন খাতে করহার ও কর্তনের পদ্ধতি নিয়ে বাস্তব সমস্যার কথা বিভিন্ন সংগঠন তুলে ধরেছে। আবার ভ্রমণ কর ও দান কর আইন দীর্ঘদিন আগে প্রণীত হওয়ায় বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সেগুলোর সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেট প্রস্তাব চূড়ান্ত করার আগে অংশীজনদের মতামত বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে একদিকে করব্যবস্থা সহজ ও বোধগম্য হবে, অন্যদিকে ব্যবসা–বাণিজ্যের পরিবেশও উন্নত হবে। একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে এ উদ্যোগকে কর সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ব্যবসায়ী সমাজ, কর বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকদের যৌথ অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রণীত বাজেট প্রস্তাব বাস্তবমুখী ও কার্যকর হবে—যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের রাজস্ব কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



