ছবি: সংগৃহীত
দেশে আয়কর রিটার্ন দাখিলের হার বাড়লেও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে ‘শূন্য রিটার্ন’ জমার প্রবণতা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক করদাতা প্রকৃত আয়-ব্যয়ের তথ্য গোপন রেখে শূন্য রিটার্ন দাখিল করছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে শূন্য রিটার্ন জমা দিলে তা গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এর ফলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড—দুই ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে করদাতা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)–এর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মোট জমা পড়া রিটার্নের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশই শূন্য রিটার্ন। বর্তমানে দেশে প্রায় সোয়া এক কোটি টিআইএনধারী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বছরে গড়ে ৪০ থেকে ৪২ লাখ করদাতা নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন। চলতি অর্থবছরেও একাধিক দফা সময় বাড়ানোর পর আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। শেষ সময় ঘনিয়ে আসায় কর অফিসগুলোতে চাপ বাড়ছে।
শূন্য রিটার্ন: কী এবং কেন বিতর্ক
আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী, করদাতাকে তাঁর প্রকৃত আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়–সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করতে হয়। কিন্তু কোনো করদাতা যদি প্রকৃত তথ্য গোপন রেখে আয়, ব্যয়, সম্পদ বা দায়ের কোনো একটি অথবা সবগুলো ঘর ‘শূন্য’ হিসেবে প্রদর্শন করেন, তাহলে তা সম্পূর্ণ বেআইনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; বরং আইন অনুযায়ী এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ।
বর্তমান আয়কর আইনের ৩১২ ও ৩১৩ ধারা অনুসারে, করদাতা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা অসত্য তথ্য প্রদান করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি আর্থিক জরিমানাও আরোপ করা যেতে পারে। এনবিআরের কর কর্মকর্তারা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘জিরো রিটার্ন’ বিষয়ে বিভিন্ন ভ্রান্ত পোস্ট ছড়িয়ে পড়ছে। কিছু পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, রিটার্ন ফরমের সব ঘর শূন্য দেখিয়ে জমা দিলেও কোনো সমস্যা হবে না। কর কর্মকর্তাদের মতে, এসব তথ্য বিভ্রান্তিকর এবং আইনগত ঝুঁকিপূর্ণ।
তাঁরা আরও বলেন, প্রকৃতপক্ষে কোনো করদাতার আয় করযোগ্য সীমার নিচে থাকলেও সম্পদ ও দায়–সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে। আয় না থাকলেই পুরো রিটার্ন শূন্য হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়।
রিটার্ন না দিলে কী ধরনের ঝুঁকি
আয়কর আইন অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন দাখিল না করলে করদাতাকে একাধিক জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে। আইন অনুযায়ী পাঁচ ধরনের প্রধান বিপাকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১. জরিমানা আরোপ
আয়কর আইনের ২৬৬ ধারা অনুযায়ী শর্ত সাপেক্ষে জরিমানা আরোপ করা যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে করদাতার সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য করের ১০ শতাংশ হারে জরিমানা করা হয়। এই জরিমানার সর্বনিম্ন পরিমাণ ১ হাজার টাকা। ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য ৫০ টাকা হারে অতিরিক্ত জরিমানাও যুক্ত হতে পারে।
২. কর অব্যাহতির সুবিধা সংকোচন
আইনের ১৭৪ ধারা অনুযায়ী কর অব্যাহতির সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হতে পারে। অর্থাৎ বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত, কর অবকাশসহ বিভিন্ন প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এটি করদাতার আর্থিক পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৩. অতিরিক্ত কর আরোপ
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে আরোপিত করের ওপর প্রতি মাসে ২ শতাংশ হারে অতিরিক্ত কর দিতে হতে পারে। সময় যত বাড়বে, অতিরিক্ত করের পরিমাণও তত বৃদ্ধি পাবে।
৪. পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্নের ক্ষমতা
আইন অনুযায়ী, কর কর্মকর্তারা প্রয়োজনে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিষেবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সুপারিশ বা ব্যবস্থা নিতে পারেন। শুধু বিদ্যুৎ নয়, অন্যান্য পরিষেবাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। যদিও বাস্তবে এ ধরনের পদক্ষেপ খুব বেশি নেওয়া হয় না, তবুও আইনি ক্ষমতা হিসেবে এটি বহাল রয়েছে।
৫. বেতন-ভাতা ও আর্থিক লেনদেনে জটিলতা
সরকারি ও বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আয়সীমা অতিক্রম করলে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন না দিলে বেতন-ভাতা প্রাপ্তি, পদোন্নতি কিংবা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পেতে জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণ, ক্রেডিট কার্ড বা বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও রিটার্নের প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়।
সচেতনতার আহ্বান
কর কর্মকর্তারা বলছেন, রিটার্ন দাখিলকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সঠিক ও স্বচ্ছ তথ্য প্রদান করা নাগরিক দায়িত্বের অংশ। ভুল তথ্য দিয়ে শূন্য রিটার্ন দাখিল করলে তা সাময়িকভাবে ঝামেলা এড়ানোর উপায় মনে হলেও ভবিষ্যতে বড় আইনি জটিলতার কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, করদাতাদের উচিত নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করা এবং প্রয়োজনে কর পরামর্শকের সহায়তা নেওয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভ্রান্ত পরামর্শ অনুসরণ না করে আইন অনুযায়ী সঠিকভাবে রিটার্ন দাখিল করাই নিরাপদ পথ।
সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই যথাযথ তথ্যসহ আয়কর রিটার্ন জমা দিয়ে সম্ভাব্য জেল-জরিমানা ও প্রশাসনিক জটিলতা এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



