ছবি: সংগৃহীত
চোরাচালানের নিত্যনতুন ও রোমহর্ষক কৌশলে থমকে গেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের একের পর এক সাঁড়াশি অভিযানে উদ্ধার হয়েছে আকাশচুম্বী মূল্যের অবৈধ স্বর্ণ। একই দিনে দেশের দুটি প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো হয়েছে এই চাঞ্চল্যকর অভিযান। একদিকে রান্নাঘরের সাধারণ সামগ্রী ফ্রাইপ্যান ও সবজি গ্রেটারের ভেতর নিখুঁতভাবে লুকানো স্বর্ণবার, অন্যদিকে মানবদেহের অভ্যন্তরে অর্থাৎ রেক্টামে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে রাখা কোটি কোটি টাকার ডিম্বাকৃতির স্বর্ণপেস্ট—সব মিলিয়ে একদিনেই উদ্ধার হয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকার স্বর্ণ। চোরাচালানের এমন অবিশ্বাস্য ও ভয়ংকর কৌশল দেখে রীতিমতো হতবাক অভিজ্ঞ গোয়েন্দারাও।
গত ১৮ অক্টোবর সকাল ৭টায় আবুধাবি থেকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের BS350 ফ্লাইটটি অবতরণ করে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। গোয়েন্দা জালে আগে থেকেই ধরা পড়েছিল গোপন তথ্য। সেই তথ্যের ভিত্তিতে গ্রিন চ্যানেলে কঠোর অবস্থানে ছিলেন কাস্টমস গোয়েন্দার চৌকস কর্মকর্তারা। ফ্লাইট থেকে নেমে আসা যাত্রী Kamrul Islam কাস্টমসে ১০০ গ্রাম স্বর্ণালংকার বহনের সীমিত ঘোষণা দেন। তবে গোয়েন্দাদের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে তিনি পার পেতে পারেননি; অতিরিক্ত স্বর্ণ বহনের বিষয়টি তিনি জোরালোভাবে অস্বীকার করলেও তাঁর লাগেজ তল্লাশির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে অন্যান্য সংস্থার উপস্থিতিতে তাঁর ব্যাগেজ তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়। আর তাতেই বেরিয়ে আসে অভিনব এক কারসাজি। রান্নাঘরের নিত্যব্যবহার্য দুটি বস্তু—একটি ফ্রাইপ্যান এবং একটি সবজি গ্রেটারের ভেতর অতি সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ৪টি খণ্ডিত স্বর্ণবার। উদ্ধারকৃত এই খণ্ডিত স্বর্ণবারের ওজন ৪৬৬ গ্রাম। এর সাথে যাত্রীর ঘোষিত ১০০ গ্রাম স্বর্ণালংকার মিলিয়ে মোট ৫৬৬ গ্রাম স্বর্ণ জব্দ করা হয়। শুল্ক-করাদিসহ যার বাজারমূল্য প্রায় ৯৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যা প্রায় ১ কোটি টাকার সমান।
সকালের ধাক্কা সামله ওঠার আগেই ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘটে আরও বড় ও চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা। সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে মালদ্বীপ থেকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের BS338 ফ্লাইটে ঢাকায় আসেন দুই যাত্রী Mohammed Solaiman এবং Jobayed Ahmad। তাদের চালচলনে সন্দেহ হলে গোয়েন্দারা নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি চালান। আর তখনই বেরিয়ে আসে স্বর্ণ চোরাচালানের সবচেয়ে লোমহর্ষক পদ্ধতি। এই দুই যাত্রীর মলদ্বারে বিশেষ উপায়ে লুকানো ছিল ডিম্বাকৃতির স্বর্ণপেস্টের বস্তু। প্রত্যেকের কাছ থেকে ৩টি করে মোট ৬টি ‘স্বর্ণের ডিম’ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত এই ছয়টি ডিম্বাকৃতির বস্তুর মোট প্রাথমিক ওজন ছিল ২ কেজি ৭৩৪ গ্রাম। আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য ও বর্তমান দর অনুযায়ী যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা।
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, জব্দকৃত আলামত এবং আসামিদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে নিয়মিত মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে মানবদেহে বহনের কারণে এবং তদন্তের স্বার্থে গোল্ড পোস্ট বা স্বর্ণের ডিমগুলো অবিকৃত রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে উপযুক্ত ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরেই এগুলোর নিখুঁত বিশুদ্ধ ওজন এবং প্রকৃত আর্থিক মূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানবন্দরগুলোতে কড়াকড়ি ও স্ক্যানিং ব্যবস্থা জোরদার হওয়ার কারণে অপরাধীরা নিত্যনতুন ফাঁদ পাতছে। একদিকে ঘরস্থালি ইলেকট্রনিক্স বা রান্নার উপকরণের মেটাল পার্টস কেটে স্বর্ণ গলিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে মানবদেহের মতো সংবেদনশীল অংশকে চোরাচালانের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে থেমে নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানিয়েছে, অপরাধীদের এই পরিবর্তনশীল কৌশল রুখতে তথ্যের আধুনিকায়ন, ঝুঁকিভিত্তিক যাত্রী প্রোফাইলিং এবং গোয়েন্দা নজরদারি এখন বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশের আকাশপথ ব্যবহার করে আর কোনো চক্র যেন অবৈধ স্বর্ণের চালান দেশে প্রবেশ করাতে না পারে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



