ছবি: সংগৃহীত
স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে কমিশনের দেওয়া সুপারিশগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে বিএনপি সরকার। চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে প্রস্তাবিত চার শতাধিক সুপারিশের মধ্যে ৩৩টিকে ‘আশু বাস্তবায়নযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সেগুলোর বেশির ভাগই কার্যকর করতে পারেনি। থেমে থাকা সেই প্রক্রিয়া আবার শুরু করতে কমিশনের একাধিক সদস্যের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
গত ৫ মে জাতীয় অধ্যাপক এ কে আজাদ খানের নেতৃত্বাধীন ১২ সদস্যের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেয়। পরে ১৩ আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সুপারিশগুলো স্বল্পমেয়াদি (ছয় মাস), মধ্যমেয়াদি (এক-দুই বছর) ও দীর্ঘমেয়াদি (দুই বছরের বেশি) পর্যায়ে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। স্বল্প মেয়াদে ৩৩টি সুপারিশ বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। তবে পরবর্তী সময়ে তা কমিয়ে ১৫টিতে আনা হয় এবং শেষ পর্যন্ত মাত্র ছয়টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পরপরই সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখিত ৯টি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে গত বৃহস্পতিবার ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে এই সেলের প্রধান করা হয়েছে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব সেলের সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং আরও সাতটি মন্ত্রণালয়ের সচিব এই সেলের সদস্য। এর বাইরে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং শিক্ষককে রাখা হয়েছে।
এই সেলের অন্যতম প্রধান কাজ হবে প্রত্যেক নাগরিককে একটি ইলেকট্রনিক হেলথ (ই-হেলথ) কার্ড প্রদান। এই কার্ড ব্যবহার করে দেশের যে কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে গেলে চিকিৎসকরা তাৎক্ষণিকভাবে রোগীর পূর্ববর্তী চিকিৎসা, পরীক্ষা ও ওষুধের তথ্য দেখতে পারবেন। এতে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে এবং ভুল চিকিৎসা, ওষুধের পুনরাবৃত্তি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমবে।
এ ছাড়া সেলটি যেসব বিষয়ে কাজ করবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে– ইলেকট্রনিক রেফারেল পদ্ধতি প্রণয়ন ও পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে চুক্তিভিত্তিক সেবা কাঠামো তৈরি। স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা প্রস্তাব গ্রহণ করা। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে তদারকি কাঠামো, স্বাস্থ্যকর্মীদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও পেশাগত উন্নয়নে নীতিমালা প্রস্তুত করা। অ্যাম্বুলেন্স পুল গঠন ও জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু। ঢাকার হাসপাতালগুলোতে নিরাপদ মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে সংস্কার কমিশনের সুপারিশের একটি বড় অংশই কার্যকর হয়ে যাবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, ১৮০ দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য প্রশাসনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। মানুষের কল্যাণে দেওয়া সুপারিশ ব্যস্তবায়নে কাজ করবে সরকার। স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসকের পদায়ন নিশ্চিত করা, অ্যাম্বুলেন্স সেবা উন্নত করা, মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করা এবং হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। খুব শিগগিরই বিভিন্ন হাসপাতালে আকস্মিক পরিদর্শন শুরু হবে।
বাস্তবায়নাধীন ও প্রস্তাবিত উদ্যোগ
বাস্তবায়নাধীন সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান স্বাস্থ্য আইন সংস্কার, অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু, হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ক্লিনিক্যাল ফার্মাসিস্ট নিয়োগ, জাতীয় আবশ্যক ডায়াগনস্টিক তালিকা ও খরচ নির্ধারণ, জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস নেটওয়ার্ক গঠন, ই-প্রেসক্রিপশন চালু ও প্রেসক্রিপশন অডিট এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ইউনিট শক্তিশালী করা।
এ ছাড়া বাংলাদেশ হেলথ কমিশন গঠন, আবশ্যক ওষুধ বিনামূল্যে বা ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহ, স্বাস্থ্য তথ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, বাংলাদেশ হেলথ সার্ভিসেস সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, ২৪ ঘণ্টা ফার্মেসি চালু, সবার জন্য স্বতন্ত্র হেলথ আইডি, বাধ্যতামূলক রেফারেল সিস্টেম এবং নগর স্বাস্থ্যের জন্য ১৭০টি চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ রয়েছে।
বিলুপ্ত সংস্কার কমিশনের সদস্য সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কমিশনের প্রতিবেদনের বিষয়ে যোগাযোগ করেছে। সরকারের আগ্রহ রয়েছে। আশু বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলো দ্রুত কার্যকর করা গেলে সরকারি হাসপাতালের সেবার মান ও ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়বে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, খাত সংস্কার কমিশনের সুপারিশকে প্রধান্য দিয়ে স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক জনবল কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। সাড়ে তিন হাজার নার্স ও ১০ হাজার চিকিৎসককে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
তাঁর দাবি, এসব পদোন্নতিতে কোথাও অনিয়মের অভিযোগ ওঠেনি। অতীতে এক বছরে এত চিকিৎসকের পদোন্নতির নজির নেই। তবে বর্তমান সময়ে বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প, যেমন যন্ত্রপাতি ক্রয় বা ভবন নির্মাণ সম্ভব হয়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সায়েদুর রহমান বলেন, সংস্কারের জন্য প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন, যা বড় ধরনের সরকারি সিদ্ধান্ত ছাড়া দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সারাদেশে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। বিএনপির ইশতেহারে স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত যে পরিকল্পনা রয়েছে, তার সঙ্গে কমিশনের সুপারিশ মিলিয়ে দেখা হবে। যেসব বিষয়ে মিল রয়েছে, সেগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে এগোনো হবে, প্রয়োজনে অন্য সুপারিশ নিয়েও আলোচনা করা হবে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



