ছবি: সংগৃহীত
পবিত্র রমজানের শুরুতেই রাজধানীর কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে ইফতারসামগ্রীর দোকান—সবখানেই পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি স্পষ্ট। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার সরকারি আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে বাজারে দামের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষ। গত বছরের তুলনায় এ বছর ইফতারের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দাম ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে বাজার ঘুরে দেখা গেছে।
শনিবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ঘুরে দেখা যায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় ইফতারসামগ্রীর প্রায় সবকিছুর দামই চড়া। ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গ লেবুর শরবত তৈরির প্রধান উপকরণ লেবুর দাম রীতিমতো অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ৪০ থেকে ৫০ টাকা। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৫০ শতাংশ দাম বেড়েছে। একটি মাঝারি মানের লেবুর দাম পড়ছে ২০ থেকে ২৫ টাকা, যা গত বছর ছিল ১০ থেকে ১৫ টাকা।
এক গ্লাস লেবুর শরবত তৈরিতে একটি লেবুর সঙ্গে প্রয়োজন চিনি। বাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম গত রমজানের তুলনায় ১০ টাকা বেড়েছে। খুচরা হিসেবে এক গ্লাস শরবতে চিনি খরচ হয় দুই থেকে তিন টাকার মতো। অর্থাৎ একটি সাধারণ লেবুর শরবত তৈরিতেই এখন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।
ইফতারের প্লেটপ্রতি খরচে লাফ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটি সাধারণ ইফতার প্লেটে যদি বেগুনি, আলুর চপ, পিঁয়াজু, ডিমচপ, খেজুর, মুড়ি, শসা, ছোলা, জিলাপি, বুন্দিয়া এবং কিছু ফল—যেমন আপেল, কলা, মাল্টা ও আঙুর রাখা হয়, তাহলে প্লেটপ্রতি খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১৬৮ টাকা। একই পণ্য গত বছর কিনতে খরচ হতো প্রায় ৩৪ টাকা কম। সে হিসাবে সামগ্রিকভাবে দাম বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ।
খেজুরের বাজারেও স্বস্তি নেই। বরই খেজুরের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়। প্রতি কেজিতে গড়ে ২০০ থেকে ২২৫টি খেজুর থাকে। সে হিসাবে দুটি খেজুরের দাম পড়ে প্রায় চার টাকা। বিক্রেতারা জানান, গত বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি খেজুরে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
মুড়ির কেজি ৯০ টাকা। একজন যদি ১০০ গ্রাম মুড়ি খান, তাহলে খরচ পড়বে প্রায় ১০ টাকা। ছোলার কেজি ৭৫ থেকে ৯০ টাকা হলেও ভাজা ছোলা বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা কেজি দরে। ১০০ গ্রাম ভাজা ছোলার জন্য গুনতে হচ্ছে ২০ টাকা। আলুর চপ, পিঁয়াজু ও বেগুনি প্রতিটি ১০ টাকা করে, ডিমচপ ২০ টাকা। বুন্দিয়ার কেজি ২০০ টাকা; ৫০ গ্রাম খেতে খরচ ১০ টাকা।
সবজির বাজারেও দাম চড়া। শসার কেজি ১২০ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় কেজিতে ১০ টাকা বেশি। মাঝারি মানের শসা কেজিতে ছয়টি হলে প্রতিটির দাম পড়ে ২০ টাকা। একজন অর্ধেক শসা খেলে খরচ ১০ টাকা। বেগুনের কেজিও ১২০ টাকা।
ফলের বাজারেও অস্বস্তি
ইফতারের অপরিহার্য অংশ ফলের বাজারেও বাড়তি চাপ। আপেল, মাল্টা ও আঙুরের দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে ৪০০ টাকার ওপরে। আপেলের কেজি ৪২০ টাকা; কেজিতে গড়ে আটটি হলে একটি আপেলের দাম পড়ে ৫২ টাকার বেশি। মাল্টার কেজি ৪০০ টাকা; প্রতি কেজিতে পাঁচ থেকে ছয়টি হলে প্রতিটির দাম প্রায় ৮০ টাকা। আঙুরের কেজি ৪৫০ টাকা। কলার বাজারেও আগুন—এক হালি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, অর্থাৎ প্রতিটি কলা ১২ থেকে ১৫ টাকা।
ক্রেতাদের নাভিশ্বাস
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী অপু ইসলাম বলেন, “প্রতিবছর রমজান এলে দাম বাড়ে। কিন্তু এবার প্রায় সবকিছুর দামই বেশি। আমাদের আয় তো বাড়েনি। সংসার চালিয়ে ইফতারের বাজার করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
একজন গৃহিণী বলেন, “আগে যে বাজেটে সপ্তাহের বাজার করতাম, এখন সেই টাকায় তিন-চার দিনের বেশি চলে না। বাধ্য হয়ে অনেক আইটেম কমাতে হচ্ছে।”
বিক্রেতাদের ব্যাখ্যা
বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজারেই দাম বেশি। পরিবহন খরচ, শ্রমিক মজুরি ও ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়ছে। কারওয়ান বাজারের এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, “আমরা বেশি দামে কিনে সামান্য লাভে বিক্রি করছি। আড়ত থেকে পণ্য আনতেই আগের চেয়ে বেশি খরচ হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান হাবিব বলেন, “রমজানকে ঘিরে চাহিদা বাড়ে—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, বাজারে সিন্ডিকেট প্রবণতা এবং পর্যাপ্ত মনিটরিংয়ের অভাব থাকলে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এতে সাধারণ ভোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন।”
ভোক্তা অধিকার বিশ্লেষক সৈয়দা নাসরিন আক্তার বলেন, “প্রশাসনিক অভিযান নিয়মিত ও দৃশ্যমান না হলে বাজারে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন। কেবল জরিমানা নয়, সরবরাহ চেইন স্বচ্ছ করা জরুরি।”
কৃষি বিপণন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মিজানুর রহমানের মতে, “মৌসুমি পণ্যে সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো না গেলে প্রতিবছর একই চিত্র দেখা যাবে। সরকারকে উৎপাদন থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত তথ্যভিত্তিক নজরদারি জোরদার করতে হবে।”
অভিযানে বাধা
বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নিয়মিত মনিটরিংয়ের কথা বলছে। তবে সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে অভিযানে গিয়ে বাধার মুখেও পড়তে হয়েছে কর্মকর্তাদের।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজার-এ ছোলার দাম বেশি রাখার অভিযোগে দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হলে বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ উত্তেজিত হয়ে প্রতিবাদ জানান। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কর্মকর্তারা অভিযান বন্ধ করে সরে যান।
এর আগের দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি রংপুর সিটি বাজারে অভিযান চালাতে গিয়ে একই ধরনের ঘটনার মুখোমুখি হন ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তারা। মাছবাজারে রঙিন লাইট ব্যবহার করে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করলে বাজার কমিটির পক্ষ থেকে অভিযান বন্ধের চাপ সৃষ্টি করা হয়। পরে কর্মকর্তারা সেখান থেকেও সরে আসেন।
সামনে কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান নয়—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং কঠোর নজরদারি ছাড়া রমজানকেন্দ্রিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ কঠিন। অন্যদিকে ভোক্তারা চাইছেন কার্যকর পদক্ষেপ, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নাগালের মধ্যে থাকে।
রমজানের শুরুতেই বাজারের এমন পরিস্থিতি মধ্য ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আয় স্থির থাকলেও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ইফতারের টেবিলে বৈচিত্র্য কমাতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন দেখার বিষয়—সরকারি উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



