ছবি: সংগৃহীত
দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারে প্রায় ১৩০টি আইন (নতুন আইন ও সংশোধিত আইন) প্রণয়ন করেছে। এছাড়া ৬০০টিরও বেশি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। ফলে বাস্তবভাবে সংস্কারের ছাপ দেখা যাচ্ছে। রোববার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশিত সংস্কার তালিকায় (রিফর্মস বুক) এই তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়েছে। রিপোর্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত সংস্কারের রূপরেখা ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরেছে। এসব খাতের মধ্যে রয়েছে প্রশাসন, অর্থনীতি, জ্বালানি, পরিবহণ, খাদ্য, শ্রম, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার দেশে সংস্কারের ক্ষেত্রে পাঁচটি মূল বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছে: দুর্নীতি কমানো, ডিজিটালাইজেশন, আইনের শাসন, টেকসই উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবা সহজ করা। এসব উদ্যোগ কেবল তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছ, দক্ষ ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে নেওয়া হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঠামোগত সংস্কারের রূপায়ণ শুরু করে, যার মধ্যে প্রশাসন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শ্রম, শিল্প, পরিবহণ, খাদ্য ও সামাজিক উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্র পরিচালনার খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সংস্কার কমিশন গঠন করা হয় এবং তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে ব্যাপক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যকর করা হয়। এর ফলে অর্থনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্কের অগ্রগতি, নতুন বাণিজ্য চুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং জবাবদিহি ও দুর্নীতি প্রতিরোধের কার্যক্রম নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্কারগুলো সিস্টেমে শৃঙ্খলা যথেষ্ট পরিমাণে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে জানিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, এ সময়ে ১ হাজার ২০০-এরও বেশি কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। হাজার হাজার কর্মীর জন্য মানবাধিকারকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। গঠিত কমিশনে হাজার হাজার ভুক্তভোগী এবং পরিবারের সদস্যরা সাক্ষ্য দিয়েছেন। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে পুনর্গঠন করা হয়েছে। এর নামকরণ করা হয়েছে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’। কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় পূর্বে নিষিদ্ধ করা গণমাধ্যমগুলোকে পুনরায় কার্যক্রম শুরুর অনুমতি দেওয়া হয়। সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে উম্মুক্ত সংলাপের মাধ্যমে জুলাই সনদ তৈরি করা হয়।
অর্থনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা
রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজস্ব বাড়ানো ও কর ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, অটোমেশন, কর ফাঁকি কমানো এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ। আমদানি-রপ্তানিতে হয়রানি কমাতে ‘বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো’ চালু করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অনলাইনে লাইসেন্স ও সার্টিফিকেট মিলছে। কাস্টমস বন্ড ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয় করতে কাস্টমস অ্যান্ড বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু হয়েছে। অডিট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে চালু করা হয়েছে নতুন গাইডলাইন। আর্থিক খাতে ব্যাংক রেগুলেশন অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ব্যাংক অধ্যাদেশ সংশোধন এবং গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি ও অবকাঠামো
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিশেষ আইন বাতিল করে স্বচ্ছতা ফেরানো হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতির মাধ্যমে ২০৩০ সালে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারি ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসিয়ে হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি এবং নেট মিটারিং গাইড লাইন প্রণয়ন করে বেসরকারি বিনিয়োগ ও গ্রাহকদের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্বাধীন করে ট্যারিফ নির্ধারণে জনশুনানি ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
পরিবহণ ও যোগাযোগ
জাতীয় লজিস্টিকস নীতির মাধ্যমে বন্দর ও পরিবহণ খাতে দেরি ও দুর্নীতি কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতুতে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন চালু করে ক্যাশলেস ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হয়েছে। রেলওয়েতে নতুন কমিউটার ট্রেন, নারীদের জন্য আলাদা কোচ, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসানো এবং রেলওয়ে হাসপাতাল সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি ও মৎস্য
খাদ্য খাতে ওপেন মার্কেট সেল পলিসি এবং খাদ্যবান্ধব প্রোগ্রাম নীতি চালু করে দরিদ্র মানুষের জন্য সাশ্রয়ী খাদ্য নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। গুদাম ও পরিবহণ ব্যবস্থায় ঘাটতি ও দুর্নীতি কমাতে অ্যাকশন প্ল্যান নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের জন্য ফার্মার অ্যাপস আপডেট করে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা ও মধ্যস্বত্বভোগী কমানোর চেষ্টা চলছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে দাদন প্রথা বন্ধে আইন করা এবং মাছ সংরক্ষণ আইনের সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান
এসএমই খাতকে শক্তিশালী করা, দক্ষতা উন্নয়ন, সহজ ঋণপ্রাপ্তি ও প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পরিবেশবান্ধব যানবাহন খাত গড়ে তুলতে ইলেক্ট্রিক ভেহিকল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট পলিসির প্রস্তাব করা হয়েছে। টেক্সটাইল ও পাট খাতে কাঁচামালের ন্যায্য সরবরাহ, সেবা ডিজিটাল করা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার চালু ও রেশম চাষিদের পাওনা দ্রুত পরিশোধের মতো সংস্কার অন্তর্ভুক্ত।
শ্রম অধিকার
বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধন করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজ করা, শিশুশ্রমের শাস্তি বাড়ানো, প্রভিডেন্ট ফান্ড বাধ্যতামূলক করা ও বিপজ্জনক কাজে জোর না করার বিধান আনা হয়েছে। ট্রিপার্টাইট কাউন্সিল পুনর্গঠন, নতুন আইএলও কনভেনশন অনুমোদনের উদ্যোগ, জাতীয় মজুরি নীতি প্রণয়ন এবং শ্রম আদালত সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা
চিকিৎসা শিক্ষায় মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল পুনর্গঠন, ইন্টিগ্রেটেড মডিউলার কারিকুলাম চালু, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণে প্রণোদনা বাড়ানো এবং মেডিকেল-ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষায় কোটা বাতিল ও একক পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো দক্ষ ও মানবিক ডাক্তার তৈরি করা।
পরিবেশ, দুর্যোগ ও যুব অংশগ্রহণ
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় তরুণদের স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে যুক্ত করা, জাতিসংঘের ‘আর্লি ওয়ারর্নিং ফর অল’ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার নানা উদ্যোগ তুলে ধরা হয়েছে।
সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও উন্নয়ন
হজ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, যাকাত অ্যাপস চালু, কোরআন হিফজ ও সিরাত প্রতিযোগিতা, ইমাম প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও জীবনমান উন্নয়ন, বাংলা একাডেমি সংস্কার কমিটি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আইন এবং নতুন সাংস্কৃতিক নীতির উদ্যোগ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



