ছবি: সংগৃহীত
২০২৫ সালে অবৈধ বা অনিয়মিত পথে ইউরোপে প্রবেশকারী অভিবাসীদের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছেন বাংলাদেশিরা। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের সর্বশেষ তথ্য ও বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মতে, চলতি বছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহিঃসীমান্তে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া জাতীয়তার মধ্যে বাংলাদেশিরাই প্রথম স্থানে অবস্থান করছেন।
ফ্রন্টেক্সের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থল ও সমুদ্রসীমান্তে অনিয়মিতভাবে সীমান্ত অতিক্রমের ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের সংখ্যা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি। সীমান্ত নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আগের চেয়ে জোরদার করা হলেও বাংলাদেশিদের ইউরোপমুখী অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় চলতি বছরে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
ইউএনএইচসিআরের পরিসংখ্যানেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগরীয় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করে ইউরোপে পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিরা অন্যতম বৃহৎ ও প্রতিনিধিত্বশীল একটি গোষ্ঠী। বাংলাদেশ ছাড়াও এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে আফ্রিকার দেশ মিসর এবং এশিয়ার দেশ আফগানিস্তান। তবে সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশিরাই এগিয়ে।
ফ্রন্টেক্স জানায়, বাংলাদেশি অভিবাসীরা মূলত সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় রুট ব্যবহার করে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়া হয়ে ইতালির উপকূলবর্তী অঞ্চল এবং গ্রিসের বিভিন্ন দ্বীপে পৌঁছানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই পথটি বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিবাসন রুটগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। প্রতিনিয়ত নৌকাডুবি, প্রাণহানি ও নিখোঁজের ঘটনার ঝুঁকি থাকলেও মানবপাচারকারীদের প্রলোভনে বহু বাংলাদেশি এই সমুদ্রপথে যাত্রা করছেন।
ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়াভিত্তিক মানবপাচার নেটওয়ার্কগুলো বাংলাদেশি অভিবাসীদের ইউরোপে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব চক্র ইউরোপে ভালো কাজ ও উচ্চ আয়ের আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশিদের বিপজ্জনক যাত্রায় উদ্বুদ্ধ করছে। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রেই অভিবাসীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, আবার কেউ কেউ সমুদ্রে প্রাণ হারাচ্ছেন কিংবা ইউরোপের সীমান্তে আটক হচ্ছেন।
সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশিদের ইউরোপমুখী অভিবাসনের পেছনে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদেশে তুলনামূলক ভালো আয়ের প্রত্যাশা। অনেক তরুণ উন্নত জীবনের স্বপ্নে এবং পরিবারকে আর্থিকভাবে সহায়তা করার আশায় অনিয়মিত পথে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন।
ফ্রন্টেক্স বলছে, বাংলাদেশে জনসংখ্যার চাপ, পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব এবং আয় বৃদ্ধির সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকে সহজেই মানবপাচার চক্রের ফাঁদে পড়ছেন। এই দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগিয়ে পাচারকারীরা ইউরোপে স্থায়ী হওয়ার বা বৈধ কাগজপত্র পাওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিচ্ছে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অনিয়মিত অভিবাসনের প্রবণতা থামানো যাচ্ছে না।
ইউরোপীয় সংস্থাগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে ইউরোপমুখী অনিয়মিত অভিবাসন নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক বছর ধরেই ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানো শীর্ষ জাতীয়তাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশিরা রয়েছেন। তবে ২০২৫ সালে এসে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে, যা ইউরোপীয় নীতিনির্ধারক ও সীমান্ত কর্তৃপক্ষের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশিদের পাশাপাশি মিসরীয় ও আফগান নাগরিকরাও ইউরোপে অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারীদের তালিকায় উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছেন। ফ্রন্টেক্স জানায়, মিসরীয়রা প্রধানত ইতালির দক্ষিণাঞ্চল এবং গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে পৌঁছাচ্ছেন। অন্যদিকে আফগান নাগরিকরা স্থল ও সমুদ্র—উভয় পথ ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। তবে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশিদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় তারাই শীর্ষে রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, নজরদারি বৃদ্ধি এবং মানবপাচারবিরোধী অভিযান পরিচালনা করলেও বাংলাদেশিদের অনিয়মিত অভিবাসনের ক্ষেত্রে এর প্রভাব সীমিত বলেই মনে করছে ফ্রন্টেক্স। সংস্থাটির মতে, শুধুমাত্র সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং অভিবাসনের মূল কারণগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে এই প্রবণতা কমানো কঠিন হবে।
সার্বিকভাবে ইউএনএইচসিআর ও ফ্রন্টেক্সের তথ্য বলছে, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, জীবিকার অনিশ্চয়তা এবং মানবপাচার চক্রের সক্রিয় ভূমিকার কারণে বাংলাদেশিদের ইউরোপমুখী অনিয়মিত অভিবাসন অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতি মানবিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত দিক থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে—বাংলাদেশ ও ইউরোপ উভয়ের জন্যই।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



