ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়ার পর অবশেষে লঘু শাস্তির মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এনবিআরের অতিরিক্ত কর কমিশনার সেহেলা সিদ্দিকার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং শাস্তি হিসেবে তার মূল বেতন দুই ধাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এনবিআর সংস্কার আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপ্তরিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে কর্মসূচিতে অংশ নিতে আহ্বান জানানোর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নেয়।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের সই করা সাম্প্রতিক এক আদেশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) এনবিআরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সংশ্লিষ্ট আদেশে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্তে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে জারি থাকা সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে পুনরায় চাকরিতে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট এনবিআরের কাস্টমস বিভাগের ওই অতিরিক্ত কমিশনারসহ চার কাস্টমস কমিশনারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। সে সময় এনবিআর সংস্কার আন্দোলনের কর্মসূচি পালন, দাপ্তরিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি এবং দেশের রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম ব্যাহত করার অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। ওই আদেশের পর বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়।
এনবিআরের আদেশ সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত কর কমিশনার সেহেলা সিদ্দিকা আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট, ঢাকায় কর্মরত থাকার সময় গত ২১ মে ২০২৫ তারিখে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে একাধিক বার্তা পাঠান। এসব বার্তায় তিনি এনবিআরের আয়কর, কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থল ত্যাগ করে নির্দিষ্ট কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ঢাকায় কর্মরত কর্মকর্তাদের রাজস্ব ভবনে উপস্থিত থাকতে এবং ঢাকার বাইরে কর্মরত কর্মকর্তাদের নিজ নিজ কার্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালনের নির্দেশনা দেন।
এনবিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বার্তাগুলোর মাধ্যমে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাপ্তরিক দায়িত্ব পরিত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেন এবং কার্যত আন্দোলনের একজন সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। এতে দেশের রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যা রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পরিপন্থী বলে কর্তৃপক্ষ মনে করে। ফলে বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
ঘটনার পর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করে কৈফিয়ত তলব করা হয়। তিনি লিখিত কৈফিয়ত দাখিলের পাশাপাশি ব্যক্তিগত শুনানির আবেদন করেন। পরবর্তীতে গত ৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তার উপস্থিতিতে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সেহেলা সিদ্দিকার বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তার কর্মকাণ্ড সরকারি চাকরির শৃঙ্খলার পরিপন্থী এবং সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯-এর ৩০এ বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। পাশাপাশি এটি একই বিধিমালার ৩২ বিধি অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) ধারায় বর্ণিত ‘অসদাচরণ’-এর আওতাভুক্ত।
সব নথি, কৈফিয়ত, ব্যক্তিগত শুনানি এবং তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় যে, এ ঘটনায় সর্বোচ্চ শাস্তির পরিবর্তে লঘু শাস্তি দেওয়া হবে। সে অনুযায়ী সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৪(২)(ঘ) ধারার ভিত্তিতে শাস্তি হিসেবে তার বেতন গ্রেড দুই ধাপ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অতিরিক্ত কর কমিশনার সেহেলা সিদ্দিকার মূল বেতন ৭১ হাজার ২০০ টাকা থেকে কমিয়ে ৬৫ হাজার ৮২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই আদেশে তার বিরুদ্ধে জারি করা সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে পুনরায় চাকরিতে বহাল রাখার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি প্রশাসনিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। একই সঙ্গে এটি সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি বার্তা যে, দায়িত্ব পালনে শৃঙ্খলা ও বিধিমালা মেনে চলা বাধ্যতামূলক, তবে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শেষে ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বাংলাবার্তা/এসজে
.png)
.png)
.png)



