ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য খাতের অ্যাকসেসরিজ শিল্প বড় সম্ভাবনাময় হিসেবে উঠে এসেছে। গত তিন বছরে খাতটির সরাসরি রপ্তানি দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্টেকহোল্ডারদের মতে, বিদ্যমান নীতিগত বাধাগুলো সরালে আগামী তিন বছরের মধ্যে রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএপিএমইএ)-এর তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রপ্তানিতে খাতটির অবদান ছিল ৭.৪৫ বিলিয়ন ডলার। এর বড় অংশ ‘ডিমড রপ্তানি’ (স্থানীয় রপ্তানিমুখী শিল্পে সরবরাহ), তবে সরাসরি রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১.৬ বিলিয়ন ডলার।
দুই দশক আগেও বাংলাদেশের পোশাক শিল্প অ্যাকসেসরিজের ক্ষেত্রে প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর ছিল। বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের মাধ্যমে এই খাত স্থানীয় রপ্তানিমুখী শিল্পের চাহিদার প্রায় শতভাগ মেটানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে। বর্তমানে সারা দেশে ২ হাজার সচল কারখানায় ৭ লাখেরও বেশি মানুষ কর্মরত আছেন।
বিজিএপিএমইএ-এর সভাপতি মো. শাহরিয়ার জানিয়েছেন, ‘কিছু নীতিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করলে আগামী তিন বছরে পোশাক ছাড়াও ওষুধ, কৃষি, পাদুকা ও অন্যান্য খাত মিলিয়ে সরাসরি ৫ বিলিয়ন ডলারের অ্যাকসেসরিজ রপ্তানি সম্ভব হবে।’ ২০২৩ সালে বৈশ্বিক ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ বাজারের মূল্য ছিল ৭২০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩৩ সালের মধ্যে ১,৫০২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চীনের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো ধীরে ধীরে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হওয়ায় বাংলাদেশ এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
চীন গত কয়েক বছর ধরেই উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন পণ্য তৈরিতে মনোযোগ বাড়িয়ে ধীরে ধীরে বেসিক আইটেম থেকে বেরিয়ে আসছে। ফলে তৈরি পোশাকের মতো বাংলাদেশের সামনে অ্যাকসেসরিজ পণ্য রপ্তানির ভালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে। গত দুই বছরেই বায়দা ইন্ডাস্ট্রিয়াল, জিজিন বাংলাদেশ ও তিয়ানহুই বাটনের মতো অন্তত আটটি চীনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে (ইপিজেড) বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে বা কার্যক্রম শুরু করেছে।
বিজিএপিএমইএর প্রাক্কলন অনুসারে, গত তিন বছরে প্রায় ৩০০টি নতুন অ্যাকসেসরিজ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করেছে। স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও দ্রুত ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছে। যেমন, আরএসএস থ্রেড অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ লিমিটেড গত তিন বছরে তাদের উৎপাদন দ্বিগুণ করেছে; বর্তমানে তারা ৩৫ ধরনের অ্যাকসেসরিজ তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে স্প্যানিশ রিটেইল জায়ান্ট ইনডিটেক্স গ্রুপের তালিকাভুক্ত সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক মান ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে এই খাত এখন ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে এগোচ্ছে। স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং ও ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্টের জন্য শতাধিক কারখানা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত। এমনকি ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি) জাতীয় উদ্ভাবনী পণ্যও দেশে তৈরি হচ্ছে। আরএসএস থ্রেড বিশেষ ধরনের চিপ তৈরি করছে, যেখানে পুরো সাপ্লাই চেইনের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে, যা অ্যাকসেসরিজ লেবেলের জন্য ব্যবহার করা হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন নিয়ম অনুযায়ী এটি বাধ্যতামূলক। আরএসএস থ্রেডের গ্রুপ ডিরেক্টর শেখ জুলফিকার আলী জানান, ‘এই চিপের মাধ্যমে ক্রেতারা পণ্যের উৎস ও উপকরণের সত্যতা যাচাই করতে পারবেন। পাশাপাশি জালিয়াতি রোধের জন্য আমরা ডাটা-মেট্রিক্স সিস্টেম এবং ইনভিজিবল কোডিং ব্যবস্থা চালু করেছি।’
এই খাতের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা বলছেন, তারা বৈষম্যমূলক রপ্তানি প্রণোদনা না পাওয়া এবং কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্কের মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। মো. শাহরিয়ার জানান, সরকার অন্যান্য রপ্তানি খাতকে নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে, কিন্তু অ্যাকসেসরিজ খাতকে কখনো এ সুবিধা দেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, ৩০০ জিএসএমের নিচে কাগজ আমদানি করতে হলে ৫৮ থেকে ৮২ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। এর ফলে শুল্ক পরিশোধের পরে কাঁচামাল নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে পণ্য উৎপাদন করা কঠিন হয়ে ওঠে। এছাড়া কাস্টমস ব্যবস্থাতেও তারা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



