ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার ক্ষেত্রে আটটি ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ দেখছেন গোয়েন্দারা। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আন্তঃ ও অন্তর্কোন্দল, উদ্ধার না হওয়া পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র, চরমপন্থি গ্রুপ ও পার্বত্য এলাকার সশস্ত্র গোষ্ঠী, সংখ্যালঘু ইস্যু ও ধর্মীয় অপপ্রচার, জামিনপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী, আসনভিত্তিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এবং এআই ব্যবহার করে গুজব ও অপপ্রচার। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে ১০টি পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ে। প্রতিবেদনের একটি কপি বাংলাবার্তার কাছে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আসনভিত্তিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে ভোটার, ভোটকেন্দ্র, রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা, ভৌগোলিক পরিস্থিতি, ভোটারদের বিশেষ ধরন এবং বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য ফলাফল বিশ্লেষণসহ নানা বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে আসনভিত্তিক সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে যে গণসহিংসতা, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে আন্তঃ ও অন্তর্কোন্দল, দখল-বেদখল ও চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু হয় সেসব এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
আরও বলা হয়েছে, ৫ আগস্ট পরবর্তী দেশের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অনেক অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া আওয়ামী লীগ আমলে যেসব অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর অনেক অস্ত্র এখনো জমা পড়েনি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এসব অস্ত্র ব্যবহার করে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার অপতৎপরতা চালাতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের চরমপন্থি গ্রুপ ও তিন পার্বত্য এলাকার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, অপহরণ, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। নির্বাচনের সময় কোনো পক্ষ তাদের ব্যবহার করে ওই অঞ্চলের নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত করতে পারে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের মোট জনসংখ্যার ১০ ভাগ সংখ্যালঘু। স্বার্থান্বেষী মহল নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে পারে।
নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি দেওয়াসহ ধর্মীয় অপপ্রচার চালিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা গোয়েন্দাদের।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী-১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনগুলোতে যেসব আসনে আওয়ামী লীগ সব সময়ই জয়লাভ করেছে, সেসব আসনে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হতে পারে। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, অতীতের গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোতে ১০ হাজারের কম সংখ্যক ভোটের ব্যবধানে যেসব আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে, সেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো ফলাফল পক্ষে নেওয়ার অপচেষ্টা থেকে সংঘাত-সংঘর্ষ বাড়তে পারে।
অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে গোয়েন্দাদের সুপারিশ-৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ৫ আগস্টের পর যেসব শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিন পেয়েছে তারা চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত উল্লেখ করে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষী মহল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। তাই তাদের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
গোয়েন্দাদের পরামর্শ-সংখ্যালঘু ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন, তারা প্রার্র্থী হওয়ার ক্ষেত্রে যাতে কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন না হন, নির্বাচনি প্রচারণায় সমান সুযোগ পান, সেজন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন দেওয়াসহ কোনো কাজে যেন বিতর্ক তৈরি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত-সহিংসতা এড়াতে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে হবে। সীমান্তবর্তী, চরমপন্থি, সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত আসনগুলোতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পৃথক নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। বিশেষ কিছু আসনে বিশৃঙ্খলা এড়াতে নিয়মিত সভার আয়োজন করা যেতে পারে। গুজব ও অপপ্রচার রোধে বিশেষ সাইবার মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) মাধ্যমে কেউ যেন পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে সে বিষয়ে কঠোর মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ওসিসহ সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে ভেটিং (অপরাধমূলক ইতিহাস এবং চারিত্রিক গুণাবলি সম্পর্কে তদন্ত) করার কথাও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



