ছবি: সংগৃহীত
আগামী বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ানো হতে পারে। প্যাকেট প্রতি ৫-৭ টাকা পর্যন্ত সিগারেটের দাম বাড়তে পারে। তবে সিগারেটের রাজস্ব বাড়ানো হবে না। দাম বাড়ানো ছাড়াও সিগারেট খাত থেকে সঠিকভাবে রাজস্ব আদায়ের জন্য একটি পৃথক নীতিমালা আসতে পারে। যার মধ্যে সিগারেট খাতের সুরক্ষার সব ধরনের নির্দেশনা থাকবে।
অবৈধ ও নকল সিগারেট এবং জাল স্ট্যাম্প রোধে এয়ার ও কিউআর কোড বসবে। ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া সিগারেট পেপার ও মেশিনারিজ আমদানি করা যাবে না। সিগারেট ফ্যাক্টরিতে বসানো হবে সিসি ক্যামেরা, যা এনবিআর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। সিগারেট ফ্যাক্টরি ও সরবরাহ ব্যবস্থা ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাকের আওতায় আনা হবে। যার ফলে অবৈধ ও নকল সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে। সিগারেটের দাম বাড়ানো ও অন্যান্য পদক্ষেপ নেয়ার ফলে আগামী অর্থবছর সিগারেট খাত থেকে বাড়তি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হবে বলে মনে করেন এনবিআর কর্মকর্তারা।
অপরদিকে, ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কর ফাইলে থাকা স্বর্ণ বিক্রির লাভের (গেইন) উপর ১৫ শতাংশ করারোপ করা হতে পারে। মূলত স্বর্ণ বিক্রিতে করদাতাদের উৎসাহ দিতে এই করারোপ করা হচ্ছে। বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করফাইলে থাকা স্বর্ণ বিক্রির উপর নিয়মিত হারে কর দিতে হয়।
সিগারেটের দাম বাড়ছে, অতিরিক্ত ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হবে
এনবিআর সূত্রমতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ানো হতে পারে। তবে সিগারেটে রাজস্ব বাড়বে না। কারণ সিগারেট বিক্রিতে এখন যে কর রয়েছে, তা অন্যান্য দেশের মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ। সর্বশেষ অন্তবর্তীকালীন সরকার সব ধরনের সিগারেটের দাম ও কর-দুটো বাড়িয়েছে। সিগারেটের উপর বর্তমানে কর ৬৭ শতাংশ। যার ফলে শুল্ককর বাড়ানোর সুযোগ নেই। সেজন্য আসন্ন বাজেটে সিগারেটের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর।
শুধু দাম বাড়ানো নয়, সিগারেটের সুরক্ষা ও অবৈধ সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণে বাজেটে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হতে পারে। এমনকি সিগারেট খাত নিয়ে একটি নীতিমালাও আসতে পারে। সিগারেটের দাম বৃদ্ধি ও অন্যান্য উদ্যোগ নেয়ার ফলে আগামী বাজেটে সিগারেট খাত থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসতে পারে বলে ধারণা করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।
ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া সিগারেট পেপার ও মেশিনারিজ আমদানি করা যাবে না
এনবিআর সূত্রমতে, দেশে অবৈধ সিগারেটের বাজার বেড়েই চলেছে। বহু প্রতিষ্ঠান কোন প্রকার ভ্যাট নিবন্ধন না নিয়েই বিদেশি এবং দেশি ব্র্যান্ডের নকল ও অবৈধ সিগারেট উৎপাদন করে। এসব প্রতিষ্ঠান মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা সিগারেট পেপার ব্যবহার করে। নকল ও অবৈধ এসব সিগারেটের কারণে বৈধ সিগারেটের বাজার সংকুচিত হচ্ছে, সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। নকল ও অবৈধ সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণে মাঠ পর্যায়ের ভ্যাট অফিসগুলোর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এরপরও নকল ও অবৈধ সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসছে না। অবৈধ ও নকল সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণে আসন্ন বাজেটে সিগারেট পেপার আমদানিতে কড়াকড়িতে আরোপ করা হচ্ছে।
ভ্যাট নিবন্ধিত সিগারেট কোম্পানি ছাড়া সিগারেট পেপার আমদানি করা যাবে না। বর্তমানে সিগারেট পেপার আমদানিতে মোট শুল্ককর ৫৮ দশমিক ৬০ শতাংশ, আসন্ন বাজেটে তা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হতে পারে। এছাড়া সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত মেশিনারিজ আমদানিতেও কড়াকড়ি আরোপ করা হতে পারে।
সিগারেটের স্ট্যাম্পে বসবে এয়ার ও কিউআর কোড, ফ্যাক্টরিতে বসবে ক্যামেরা
এনবিআর সূত্রমতে, সিগারেট খাত থেকে সরকার রাজস্ব আদায়ে জোর দিচ্ছে। সেজন্য অবৈধ সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণসহ সঠিকভাবে রাজস্ব আদায়ে একটি কাঠামো বা নীতিমালা করা হচ্ছে, যা আসন্ন বাজেট থেকে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। বর্তমানে বাজারে থাকা দেশি ও বহুজাতিক-সব কোম্পানির বিরুদ্ধে কম-বেশি সিগারেটে নকল বা জাল স্ট্যাম্প ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। আবার সিগারেট খাতের অনেক অসাধু ব্যক্তি রাজস্ব ফাঁকি দিতে নকল ও অবৈধ সিগারেটে জাল স্ট্যাম্প ব্যবহার করে সিগারেট বাজারজাত করেন।
সিগারেটে জাল ও নকল স্ট্যাম্প ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে সিগারেট স্ট্যাম্পে এয়ার ও কিউআর কোড ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। এছাড়া সিগারেট খাতকে ডিজিটাল নজরদারির অংশ ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ সিগারেটের উৎপাদন থেকে বাজারজাতের ওপর সার্বক্ষনিক নজর রাখা হবে। সিগারেট ফ্যাক্টরিতে সিসি ক্যামেরা বসানো হবে, যা এনবিআর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ভ্যাট আইন সংশোধনের মাধ্যমে সিগারেট খাতকে সুরক্ষা ও সঠিক রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করা হবে। দেশের দুইটি প্রতিষ্ঠান সিগারেট ও বিড়ির পেপার তৈরি করে। এই দুইটি প্রতিষ্ঠানকেও নজরদারির আওতায় আনা হতে পারে।
স্বর্ণ বিক্রিতে গেইন ট্যাক্স
এনবিআর সূত্রমতে, প্রতিটি করদাতার আয়কর ফাইলে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ দেখানো হয়। মূলত করদাতাদের করফাইল ভারি করতে এই স্বর্ণ দেখানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে করদাতার সক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি স্বর্ণ তার ফাইলে দেখানো হয়। যদিও অনেকে স্বর্ণ উত্তরাধিকার সূত্রে, উপহার হিসেবে বা ক্রয় করে থাকে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বর্ণ বিক্রি থেকে সরকার কোনো কর পায় না। যদিও স্বর্ণ বিক্রি করে করদাতারা নিয়মিত হারে কর দিয়ে তার ক্যাপিটাল বা মূলধন বাড়াতে পারেন। আসন্ন বাজেটে করদাতাদের স্বর্ণ বিক্রি করফাইলে সঠিকভাবে দেখাতে গেইন ট্যাক্স চালু করা হতে পারে। তবে এই গেইন ট্যাক্সের পরিমাণ ১৫ শতাংশ হতে পারে। একজন করদাতা যেদিন থেকে আয়কর ফাইল খুলেছেন, সে সময় স্বর্ণের দাম যা ছিলো, বর্তমানে বিক্রির সময় যে দাম পাবেন, করফাইল খোলার দামের থেকে বিক্রির দাম বাদ দিলে যে লাভ বা গেইন হবেন, তার উপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে।
করছাড় আসতে পারে
এনবিআর সূত্রমতে, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং ব্যবসায়ের খরচ কমাতে আসন্ন বাজেটে ১৬ ধরণের ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর কিংবা স্থানীয় পর্যায়ে উৎসে করের হার কমতে পারে। এছাড়া নতুন, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য করছাড় ছাড় আসতে পারে। বড় আকারের করছাড় আসতে পারে মোবাইল ফোনসহ ইলেক্ট্রনিক খাতের বিনিয়োগকারী, রিনিউয়েবল এনর্জি, ইলেক্ট্রিক ভেহিক্যাল ইমপোর্ট ও স্থানীয় বিনিয়োগে।
স্বাস্থ্য খাতের জন্যও আসছে বড় ছাড়। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রপ্তানিকে উৎসাহিত করতে ক্যাশ ইসনেসটিভ এর উৎসে কর বিদ্যমান ১০ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশ হতে পারে। কম্পিউটারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে এডভান্স ইনকাম ট্যাক্স ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ হতে পারে। স্থানীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনে ২২ ধরণের উপকরনের এআইটি কমে ১ শতাংশ হতে পারে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ওয়েলসিড থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারীদের জন্য ১০ বছরের কর অব্যাহতি আসতে পারে। রিসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিকে উৎসাহিত করতে এ খাতের কাঁচামাল সাপ্লাইয়ের ট্যাক্স ৩ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ হতে পারে।
স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আসতে উৎসাহিত করতে গোল্ড ও অর্নামেন্টের এআইটিতে বিশাল ছাড় দেওয়া হতে পারে। এসব খাতের পন্যের আমদানিতে বিদ্যমান ট্যাক্স ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হতে পারে। বিদ্যমান জ্বালানি সংকট ও অনিশ্চয়তায় ইলেক্ট্রিক ভেহিক্যাল ও ইলেক্ট্রিজ চার্জিং স্টেশন স্থাপনের যন্ত্রপাতি আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ এআইটি পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হতে পারে। এছাড়া ইলেক্ট্রিক ভেহিক্যাল রেজিস্ট্রেন ফি বর্তমানে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আছে, যা অর্ধেক কমানো হতে পারে। অন্যদিকে রিফাইনারির ফুয়েল সাপ্লাইয়ের সোর্স ট্যাক্স দেড় শতাংশ থেকে কমে ১ শতাংশ, মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার ক্ষেত্রে ১২ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ, প্যাকেজিং ম্যাটারিয়েল এর ট্যাক্স ৫ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশ হতে পারে।
অন্যদিকে ট্রান্সপোর্ট, ক্যারিং ও ভেহিক্যাল রেন্টাল সার্ভিসের সোর্স ট্যাক্স ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ হতে পারে। অন্যদিকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বড় ধরণের ছাড় দিতে যাচ্ছে সরকার। এক্ষেত্রে বিদ্যমান এআইটি ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ, স্থানীয় পর্যায়ে সাপ্লায়ের ক্ষেত্রেও একই হারে কমতে পারে। নন-রেসিড্যান্টদের কাছে মেশিনারে সাপ্লায়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সোর্স ট্যাক্স ১৫ শতাংশ থেকে অর্ধে কমতে পারে। নন-রেসিড্যান্টদের কে প্রদত্ত ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম এর সোর্স ট্যাক্সও অর্ধেক করা হতে পারে। একইভাবে অফশো’র সোর্স থেকে নেওয়া লোনের ইন্টারেস্ট পে করার ক্ষেত্রে সোর্স ট্যাক্স ২০ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ করা হতে পারে।
বাংলাবার্তা/এমএইচ
.png)
.png)
.png)



